করতোয়ার প্রাণ ফেরাতে নতুন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে

· Prothom Alo

বগুড়ার করতোয়া নদী পুনঃখননের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। পুনঃখনন করা হবে নদীটির ২৩০ কিলোমিটার গতিপথ। এ জন্য ১ হাজার ১২২ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, নদীটি পুনঃখনন করা হলে তাতে করতোয়া, ইছামতী ও গজারিয়া নদীতে আবারও পানির স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ফিরে আসবে। তাতে সংশ্লিষ্ট এলাকার সেচসুবিধা যেমন বাড়বে, তেমনি বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীর তীর ভাঙন ও দখল-দূষণ প্রতিরোধ করা যাবে।

Visit bettingx.bond for more information.

পরিকল্পনা কমিশনের সূত্রে জানা যায়, ৬ এপ্রিল অনুষ্ঠেয় বিএনপি সরকারের প্রথম জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় নতুন এ প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করা হবে। এরই মধ্যে একনেক সভার জন্য এ প্রকল্পসহ মোট ১৭টি প্রকল্প তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। গত সোমবার পরিকল্পনা কমিশনে পরিকল্পনামন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর উপস্থিতিতে একনেক প্রস্তুতি সভায় তালিকার চূড়ান্ত খসড়া তৈরি করা হয়েছে। উল্লেখ্য, করতোয়া পুনঃখনন প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বগুড়ার সংসদীয় এলাকাভুক্ত।

করতোয়া নদী পুনঃখনন প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বগুড়া শহরের মৃতপ্রায় নদীটিতে প্রাণ ফিরিয়ে আনতে ও শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য যাচাই–বাছাইয়ের পর প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছে।

জানতে চাইলে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সচিব এস এম শাকিল আখতার প্রথম আলোকে বলেন, ‘মরা নদীটি থেকে দুর্গন্ধ ছড়ায় এখন। তাতে এলাকার মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাস নেওয়াও কষ্টকর। তাই মানুষের উপকারের জন্য প্রকল্পটি নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় নদীটি পুনঃখনন করে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা হবে। নদীর দুই পাশে পাড় বেঁধে কিছু জায়গায় বাচ্চাদের খেলার মাঠ তৈরি করা হবে।’

স্থানীয় মানুষের ভাষ্যমতে, একসময় এ নদী দিয়ে খুলনা থেকে নৌকায় করে নারকেল আসত। নদীকে ঘিরে জেলেদেরও জীবিকা নির্বাহ হতো। কিন্তু এরশাদ সরকারের আমলে বন্যা নিয়ন্ত্রণে নদীর উৎসমুখে বাঁধ নির্মাণ করা হলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এ কারণে আশির দশক থেকে নদীটির শীর্ণ দশা শুরু। স্থানীয় মানুষেরা ২০১০ সাল থেকে ‘করতোয়া বাঁচাও আন্দোলন’ নামে একটি সংগঠনের ব্যানারে নদী উদ্ধারে আন্দোলন চালিয়ে আসছেন।

সংগঠনটির সদস্যসচিব ও পরিবেশবাদী সংগঠন বাপার বগুড়া জেলার সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান জানান, আশির দশকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বালুতে নদীটির উৎসমুখ বন্ধ হয়ে যায়। এখন আবার পৌরসভার সব ড্রেন গিয়ে নদীতে পড়ছে। তাই দুর্গন্ধে মানুষ এখন নদীর পাড়ে যেতে পারে না।

কী আছে প্রকল্প প্রস্তাবে

প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রস্তাবিত প্রকল্পটি অনুমোদিত হলে এটির কাজ শেষ হবে ২০৩০ সালের জুন মাসে। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২৪ হেক্টর ভূমি অধিগ্রহণ করা হবে। নদীতীরবর্তী ছয় কিলোমিটার স্লোপ প্রকেটশনের মাধ্যমে শহরের ঘরবাড়ি, বিভিন্ন স্থাপনাসহ সাড়ে তিন কিলোমিটার নদীতীর রক্ষায় উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ জন্য নির্মাণ করা হবে প্রায় এক কিলোমিটার বাঁধ। এ ছাড়া থাকবে সংশ্লিষ্ট নানা স্থাপনা ও ব্যবস্থা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ২০২৩ সালে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছিল। মোট ৯টি উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। এসব উপজেলার মধ্যে রয়েছে বগুড়ার শিবগঞ্জ, বগুড়া সদর, শাজাহানপুর, দুপচাঁচিয়া, আদমদীঘি, গাবতলী, ধুনট, শেরপর ও গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ। সম্পূর্ণ দেশীয় অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে প্রকল্প প্রস্তাবে।

প্রস্তাবে প্রকল্পটির পটভূমি সম্পর্কে বলা হয়েছে, করতোয়া নদীটি পূর্ব তিস্তা নদীর তিনটি শাখার একটি শাখা। ১৭৮৭ সালে এক বন্যায় তিস্তা নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে যায়। নদীটি যুক্ত হয়ে যায় ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর সঙ্গে। ফলে করতোয়ার মূল উৎস তিস্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এতে নদীটি মৌসুমি বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বর্ষা ছাড়া পানিপ্রবাহ না থাকায় নদীটি ব্যাপক দখল ও ভরাটের মুখে পড়ে। তাতে নদীটির অস্তিত্বই এখন হুমকির মুখে। করতোয়ার শাখা নদী ইছামতী–গজারিয়ার পানিপ্রবাহও কমে গেছে। তাই স্থানীয় জনদাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন

দীর্ঘদিন ধরে বগুড়ায় করতোয়া নদী রক্ষা আন্দোলনে সক্রিয় রয়েছে বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক ও সামাজিক সংগঠন। তারা জানায়, বিগত অন্তর্বর্তী সরকার করতোয়া নদীকে অবৈধ দখলমুক্ত করতে কিছু কাজ করলেও তা ছিল অসম্পূর্ণ। নদীটি রক্ষায় গত বছর নদী সম্মেলন করেছিল বেসরকারি সংস্থা অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি)।

প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রকল্পটি কৃষি ও পরিবেশ রক্ষায় দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে। করতোয়া নদীর পাশাপাশি দেশের অন্যান্য নদী রক্ষায়ও ধাপে ধাপে সরকারকে এগিয়ে আসা উচিত।’ করতোয়া নদীর পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা গেলে সেচের পানির জন্য বড় কাজ হবে বলে জানান তিনি।

Read at source