টেকসই ফ্যাশনের বার্তা নিয়ে লন্ডন ফ্যাশন উইকে তানভীর মাহিদী
· Prothom Alo

লন্ডন ফ্যাশন উইক ২০২৬-এ তানভীর মাহিদীর অংশগ্রহণ বাংলাদেশের ফ্যাশন ইতিহাসে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, যেখানে সৃজনশীলতা, টেকসই ভাবনা ও বৈশ্বিক পরিচয়ের শক্তিশালী সমন্বয় ফুটে উঠেছে।
Visit sweetbonanza.qpon for more information.
বৈশ্বিক ফ্যাশন মানচিত্রে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ; তবে সেটা মূলত তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য। সৃজনশীলতার মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত। সেই বাস্তবতায় ম্যানচেস্টারভিত্তিক বাংলাদেশি ফ্যাশন ডিজাইনার তানভীর মাহিদীর লন্ডন ফ্যাশন উইক ২০২৬-এ অংশগ্রহণ শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়; বরং একটি ঐতিহাসিক–সাংস্কৃতিক মুহূর্তও, যা বাংলাদেশের ফ্যাশনকে বিশেষ পরিচয় দিয়েছে।
ব্যাকস্টেজে তৈরি মডেলরাএই অর্জনকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে এর প্রতীকী গুরুত্ব। কারণ, ১৮ কোটির বেশি মানুষের দেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক—সেই বাংলাদেশের একজন ডিজাইনার যখন বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ফ্যাশন মঞ্চে নিজের কাজ উপস্থাপন করেন, তখন তা কেবল একটি শো নয়; বরং একটি জাতির সৃজনশীল আত্মপ্রকাশ। লন্ডনে বাংলাদেশের হাইকমিশনারের উপস্থিতি এই মুহূর্তকে আরও গৌরবান্বিত করেছে, যা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির ইঙ্গিতও বহন করে।
তানভীর মাহিদীর সৃজনযাত্রা এক দিনে গড়ে ওঠেনি। ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে কাজের মধ্য দিয়ে তাঁর পেশাগত ভিত্তি তৈরি হয়। বেক্সিমকোর মতো বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে নোয়াইজ জিনস, কোয়াজি আবেদিন এবং ম্যাকসনের মতো প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। বিশেষ করে ডিজাইন ও ব্যবসায়িক উন্নয়ন—দুই ক্ষেত্রেই তাঁর দক্ষতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে দিয়েছে বাস্তবভিত্তিক জ্ঞান, যা আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তানভীর মাহিদীতানভীরের ডিজাইন ক্যারিয়ারের আরেকটি শক্তিশালী দিক হলো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা। জারা, বারশকা, পুল অ্যান্ড বেয়ার, ক্যালভিন ক্লেইন, ডিজেল, এইচঅ্যান্ডএম, প্রাইমার্কসহ বহু বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের জন্য ডিজাইন করার মাধ্যমে তিনি বুঝেছেন বাজারের চাহিদা, ট্রেন্ড এবং বাণিজ্যিক বাস্তবতা। এই অভিজ্ঞতা তাঁর সৃজনশীলতাকে করেছে আরও প্রাসঙ্গিক ও কার্যকর।
তানভীরকে আলাদা করে তোলে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি— যেখানে ফ্যাশন শুধুই পোশাক নয়, বরং একটি ভাষা। লন্ডন ফ্যাশন উইকে উপস্থাপিত তাঁর কালেকশন ছিল সেই ভাষারই এক শক্তিশালী প্রকাশ। ডেনিম শিল্পে বিপুল পরিমাণ কাপড় অপচয় এবং পরিবেশদূষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে তিনি পুরো কালেকশনটি তৈরি করেন ফ্যাক্টরির ফেলে দেওয়া কাপড় দিয়ে; অর্থাৎ যেগুলো সাধারণত বর্জ্য হিসেবে বিবেচিত হয়, সেগুলোকেই তিনি রূপ দিয়েছেন উচ্চমানের ফ্যাশনে।
ফেলে দেওয়ার ডেনিম থেকে তৈরি হয়েছে পোশাকএখানেই শেষ নয়। তানভীরের কাজে উঠে এসেছে বাংলাদেশের পরিবেশগত বাস্তবতাও। বুড়িগঙ্গা নদীর দূষণ, শিল্পবর্জ্যের প্রভাব—এসব বিষয় তাঁর ডিজাইনকে দিয়েছে গভীর সামাজিক প্রেক্ষাপট। পুনর্ব্যবহৃত ডেনিমের সঙ্গে জুট বা পাটের ব্যবহার শুধু নান্দনিকতার জন্য নয়; বরং এটি ছিল পরিবেশবান্ধব ফ্যাশনের একটি সুস্পষ্ট বার্তা।
এই কালেকশনের নকশায় ছিল ডিকনস্ট্রাক্টেড সিলুয়েট, লেয়ারিং এবং ডেনিমের নতুন ব্যবহার—যা একই সঙ্গে আধুনিক ও প্রতিবাদী। প্রতিটি পোশাক যেন একটি গল্প বলেছে—অপচয়ের বিরুদ্ধে, দূষণের বিরুদ্ধে এবং সচেতনতার পক্ষে। ফ্যাশন যে একটি সামাজিক বক্তব্যের মাধ্যম হতে পারে, তানভীর তারই প্রমাণ দিয়েছেন।
লন্ডন ফ্যাশন উইকের র্যাম্পেতানভীরের ক্যারিয়ারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, চলচ্চিত্র ও বিজ্ঞাপনে কস্টিউম ডিজাইনার হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা। খ্যাতিমান নির্মাতা অমিতাভ রেজা চৌধুরীর সঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে তিনি ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিংয়ের অভিজ্ঞতাও অর্জন করেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁর ‘রানওয়ে’ উপস্থাপনাকে করেছে আরও নাটকীয় ও অর্থবহ।
তানভীর মাহিদীর এই সাফল্য নতুন প্রজন্মের জন্য একটি বার্তা বহন করে—বাংলাদেশ শুধু উৎপাদনশীল শক্তি নয়, সৃজনশীল শক্তিও। সঠিক দিকনির্দেশনা, শিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক এক্সপোজার থাকলে বাংলাদেশি ডিজাইনাররা বৈশ্বিক ফ্যাশন মঞ্চে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম।
সবশেষে বলা যায়, তানভীর মাহিদীর এই যাত্রা কেবল একজন ডিজাইনারের সাফল্যের গল্প নয়—এটি একটি দেশের আত্মবিশ্বাসের গল্প। ফ্যাক্টরির মেঝে থেকে শুরু করে লন্ডনের র্যাম্প—এই পথচলা প্রমাণ করে, ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ এখন শুধু একটি ট্যাগ নয়, এটি একটি শক্তিশালী পরিচয়, যা বিশ্বকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
ছবি: তানভীর মাহিদী