‘দুমড়েমুচড়ে যাওয়া বাসের ভেতর মানুষগুলো কাতরাচ্ছিল’

· Prothom Alo

দুমড়েমুচড়ে পড়ে আছে বাস। কোথাও লেগে আছে রক্তের ছাপ। বাসের ভেতরে–বাইরে রক্তমাখা জুতা। ছড়িয়ে আছে খাবার, ফল, পানির বোতল, রান্না করা তরকারি, মিষ্টির প্যাকেটসহ অনেক কিছু।

পাশেই রেললাইনের পাথর, লোহার শিকেও লেগে আছে রক্তের দাগ, পড়ে আছে বাসের ভাঙা কাচ, ভাঙা জানালা অংশ, ফ্যান। বাসের ভেতরেও বিভিন্ন সিটে লেগে আছে মানুষের রক্ত।

Visit extonnews.click for more information.

আজ রোববার বেলা ১১টায় এমন দৃশ্য দেখা যায় ঢাকা–চট্টগ্রাম রেলপথের কুমিল্লার দৈয়ারা গ্রামের রেলক্রসিংয়ে। গতকাল শনিবার দিবাগত রাত ২টা ৫৫ মিনিটে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে উঠে পড়া একটি বাসের সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১০ জন।

দুর্ঘটনার সময় স্থানীয় লোকজন তাৎক্ষণিক অ্যাম্বুলেন্স, ৯৯৯ এবং ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পায়নি বলে অভিযোগ করেন আরিফুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রায় ২ ঘণ্টা পরে তারা আসে। তখন উদ্ধারকাজ প্রায় শেষ।

আরিফুল উদ্ধারকাজের বর্ণনা দিতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ছিলেন। তিনি বলেন, ‘এমন পরিস্থিতিতে কখনো পড়তে হয়নি। দৃশ্য দেখে ভয়ে শরীরটা কাঁপুনি দিয়ে ওঠে। আগেও ট্রেনের সঙ্গে বাসের দুর্ঘটনা দেখেছি। কিন্তু এটা ভয়াবহ ছিল।’

‘বিকট শব্দে ঘুম ভাঙতেই দেখি, ট্রেন বাসটিকে মুখে করে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে’

হতাহত ব্যক্তিদের উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের আরেকজন মো. জামাল হোসেন। তাঁর বাড়িও দুর্ঘটনাস্থলের পাশে দৈয়ারা গ্রামে। বয়স ৪৭ বছর। তিনি বলেন, ‘এই ৪৭ বছরে এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনা দেখেনি।’

দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার দৈয়ারা গ্রামের আরিফুল ইসলাম উদ্ধারকাজে অংশ নেন

দুর্ঘটনার পর ট্রেনটি পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড রেলক্রসিং থেকে বাসটিকে অন্তত ১ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে পার্শ্ববর্তী দৈয়ারা গ্রাম পর্যন্ত নিয়ে আসে।

দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে দৈয়ারা গ্রামের বাসিন্দারা উদ্ধারকাজে এগিয়ে আসেন। তাঁদের একজন আরিফুল ইসলাম। তাঁর বয়স ২১ বছর। তিনি অন্তত ২০ জনকে দুমড়েমুচড়ে যাওয়া বাস থেকে বের করার কাজে অংশ নেন।

নিহত ১২ জনের মধ্যে আছেন মা–দুই মেয়ে, স্বামী-স্ত্রী

আরিফুল ইসলাম উদ্ধারকাজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রথমে নিহত একজনের মাথা খুঁজে পাই দুর্ঘটনাস্থল রেললাইনের পাশে। পরে তাঁর দেহ খুঁজতে ভেতরে গিয়ে আঁতকে উঠি। রক্তে পুরো বাস ভেসে গিয়েছিল। কয়েকজন তখনো বেঁচে ছিলেন। তাঁরা শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এক বৃদ্ধের দুই পা ভেঙে আলাদা হয়ে গেছিল। এসব দেখে উদ্ধার করতে গিয়ে আমি নিজেকে ঠিক রাখতে পারছিলাম না।’

জামাল হোসেন জানান, উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়ার পর মানুষ উদ্ধার করতে করতে তাঁর শরীরের সব কাপড় রক্তে ভিজে যায়।

দুই গেটম্যান বরখাস্ত, তিন তদন্ত কমিটি, চট্টগ্রামের সঙ্গে রেল যোগাযোগ চালু

ট্রেন যখন বাসটিকে টেনে দৈয়ারা গ্রাম পর্যন্ত নিয়ে আসে, তখন বাড়িতে শোয়া অবস্থায় ছিলেন জামাল হোসেন। ট্রেনের আওয়াজ শুনে তিনিসহ অন্যরা দৌড়ে আসেন। তিনি বলেন, ‘প্রথমে ট্রেনের ইঞ্জিন খুঁজে পাচ্ছিলাম না। পরে দেখি বাসের ভেতরে ট্রেনের ইঞ্জিন ঢুকে আছে। দুমড়েমুচড়ে যাওয়া বাসের ভেতর মানুষগুলো কাতরাচ্ছিল।’

দুর্ঘটনাস্থলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বাসের যাত্রীদের মালামাল

উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের আরেকজন বিজয় দেবনাথ। তিনিও দৈয়ারা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে খারাপ লেগেছে যখন একজন নিহত শিশুকে কোলে নিয়ে নামিয়েছিলাম। তাঁর মগজ বের হয়ে গেছিল।’

Read at source