শুধু দোয়া করাই একটি ইবাদত
· Prothom Alo

মহান আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ ও তাঁর নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম হলো ইবাদত। সাধারণত ইবাদত বলতে আমরা কেবল নামাজ বা রোজা পালনকেই বুঝে থাকি। কিন্তু যেকোনো সময়, যেকোনো স্থানে আল্লাহর অত্যন্ত প্রিয় একটি ইবাদত করা যায় যা আমাদের অনেকেরই অজানা। আর তা হলো দোয়া করা।
আমরা সাধারণত নামাজ শেষে হাত তুলে দোয়া করতে অভ্যস্ত। এটি আমাদের কাছে অনেকটা নিয়মে পরিণত হয়েছে; ফলে মনে হতে পারে ইবাদত হলো মূল কাজ আর দোয়া তার একটি পরিশিষ্ট মাত্র। আবার অনেক সময় আমরা কেবল বিপদে পড়লেই দোয়ার কথা স্মরণ করি। চাকরি না থাকলে, অসুস্থ হলে কিংবা পরীক্ষার আগে আমরা আল্লাহর দ্বারস্থ হই। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পেয়ে গেলে কিংবা জীবন স্বাভাবিক ছন্দে ফিরলে আমরা ভুলে যাই যে, আল্লাহর কাছে আমাদের চাওয়ার অন্ত নেই।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
একটি হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, দোয়াই হলো ইবাদত (তিরমিজি: ২৯৬৯)। এ কথা বলার পর তিনি কোরআনের আয়াত তিলাওয়াত করেছিলেন যেখানে আল্লাহ বলছেন, ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। যারা অহংকারবশত আমার ইবাদত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তারা অপমানিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে’ (সুরা গাফির, আয়াত: ৬০)। এই আয়াতে লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, আল্লাহ দোয়া শব্দটিকে ইবাদত হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। আলেমরা বলেন, দোয়া না করা মানে হলো আল্লাহর ইবাদত থেকেই মুখ ফিরিয়ে নেওয়া।
কেন আমরা ভুলে যাই? ইসলাম কী বলেদোয়া না করলে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন
মানুষের কাছে বারবার কিছু চাইলে সে বিরক্ত হয়, কিন্তু আল্লাহর কাছে চাইলে তিনি খুশি হন। মহানবী (সা.) বলেছেন, যে আল্লাহর কাছে চায় না, আল্লাহ তার ওপর রাগ করেন (তিরমিজি: ৩৩৭৩)। এই একটি হাদিসই দোয়ার গুরুত্ব বোঝানোর জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ চান তাঁর বান্দা নিরন্তর তাঁর কাছে চাক এবং তাঁর অভিমুখী হোক। তাই দোয়া না করা আল্লাহর অসন্তুষ্টির একটি কারণ।
যখন একজন বান্দা আল্লাহর কাছে হাত তোলে, সে আসলে নিজের অসহায়ত্ব আর দুর্বলতাকেই স্বীকার করে নেয়। এই স্বীকৃতির নামই হলো ‘আবদিয়ত’ বা দাসত্ব। দোয়াকারী তখনই আল্লাহর দরবারে হাত তোলে যখন সে নিশ্চিত হয় যে আল্লাহ ছাড়া তার কল্যাণ করার বা ক্ষতি দূর করার আর কেউ নেই। এই নিশ্চয়তাই হলো তাওহিদ ও ইখলাসের সারকথা, যা যেকোনো ইবাদতের মূল ভিত্তি।
দোয়া কখনো বৃথা যায় না
দোয়ার মাধ্যমে মানসিক প্রশান্তি আসে। এমনকি আমাদের কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি না পেলেও দোয়া করার সওয়াব থেকে আমরা বঞ্চিত হই না। মহানবী (সা.) বলেছেন, যখনই কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে এমন কোনো দোয়া করে যাতে কোনো পাপ নেই এবং কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয় নেই, আল্লাহ তাকে তিনটি বিষয়ের যেকোনো একটি অবশ্যই দান করেন: ১. হয় তার দোয়া দুনিয়াতেই দ্রুত কবুল করেন; ২. অথবা তার জন্য তা পরকালের পাথেয় হিসেবে জমা রাখেন; ৩. কিংবা তার থেকে সমপরিমাণ কোনো বড় বিপদ বা অনিষ্ট দূর করে দেন।
এ কথা শুনে সাহাবিরা বললেন, তবে তো আমরা প্রচুর পরিমাণে দোয়া করব। মহানবী (সা.) বললেন, আল্লাহর ভাণ্ডার তার চেয়েও বড় (মুসনাদে আহমাদ: ১১১৩৩)।
যে ৫ আমল আল্লাহ বেশি পছন্দ করেনজীবনের নানা ক্ষেত্রে দোয়া
দোয়াকে আমরা কেবল বিপদের হাতিয়ার মনে করি, কিন্তু মহানবী (সা.)-এর জীবন ছিল দোয়াময়। ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে ঘুমানো পর্যন্ত—খাওয়া, পোশাক পরা, ঘর থেকে বের হওয়া বা ঘরে ঢোকা—সবকিছুতেই তাঁর নির্দিষ্ট দোয়া ছিল (বুখারি: ৬৩১১)। সুখে-দুঃখে তিনি সবসময় আল্লাহমুখী থাকতেন। দোয়া তাঁর কাছে কেবল বিপদের প্রতিক্রিয়া ছিল না, বরং ছিল প্রতিদিনের অন্যতম ইবাদত।
দোয়ার জন্য আলাদা করে সময়ের প্রয়োজন হয় না। আমাদের প্রতিদিনের ব্যস্ততার মাঝেও অসংখ্য মুহূর্ত আছে যখন আমরা দোয়া করতে পারি। যানজটে বসে থাকা কিংবা কারো জন্য অপেক্ষা করার সময়টুকুতে মনে মনে দোয়া করা সম্ভব। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারো জন্য কল্যাণ কামনা করাও একটি দোয়া। তবে এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি—অন্যের দোয়ার পোস্টে কমেন্টে কেবল ‘আমিন’ লেখা যথেষ্ট নয়, আমিন মূলত মুখে উচ্চারণ করতে হয়। বরং কারো ভালো কোনো সংবাদ পেলে ‘মাশাআল্লাহ’ অথবা ‘আল্লাহ কবুল করুন’—এমন অর্থপূর্ণ দোয়া করা যেতে পারে।
যিনি নিয়মিত দোয়া করেন, তাঁর কণ্ঠস্বর আল্লাহর কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে। পক্ষান্তরে যে কেবল বিপদে পড়ে দোয়া করে, তার ডাক কিছুটা অপরিচিত হিসেবে আসমানে পৌঁছায়। মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি চায় যে কঠিন বিপদ-আপদ ও সংকটের সময় আল্লাহ তার দোয়া কবুল করুন, সে যেন সচ্ছল ও সুখের সময়ে বেশি বেশি দোয়া করে (তিরমিজি: ৩৩৮২)।
দোয়ার পদ্ধতি
দোয়ার আদব হিসেবে পবিত্র থাকা, কিবলামুখী হওয়া এবং আল্লাহর প্রশংসা ও দরুদ দিয়ে শুরু করা গুরুত্বপূর্ণ। তবে সম্ভব না হলে যেকোনো অবস্থায় দোয়া করা যায়। নারীরা তাঁদের পিরিয়ড চলাকালীন যখন নামাজ পড়তে পারেন না, তখনও বেশি বেশি দোয়া করার মাধ্যমে ইবাদত চালিয়ে যেতে পারেন। দোয়া নিজের ভাষায় নিজের মতো করে করা যায়, তবে কোরআনের আয়াতে বর্ণিত দোয়া বা মহানবী (সা.)-এর শেখানো দোয়া সবচেয়ে উত্তম।
দোয়া আল্লাহর কাছে কবুল হওয়ার জন্য সবচেয়ে বড় শর্ত হলো হালাল উপার্জন। কারণ হারাম খাবার গ্রহণ করলে দোয়া কবুল হয় না (মুসলিম: ১০১৫)। মনে রাখতে হবে, দোয়া কেবল চাওয়ার মাধ্যম নয়, বরং এটি স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির গোপন আলাপন। এই আলাপন বান্দাকে আল্লাহর অনেক কাছে নিয়ে যায়। আর আল্লাহর নৈকট্য অর্জনই ইবাদতের চূড়ান্ত লক্ষ্য।
আমাদের জীবনে আল্লাহর রহমত কীভাবে আসবে