নবগঠিত সংসদ বিলম্ব না করে প্রয়োজনীয় সংস্কার করবে, প্রত্যাশা জাপানি রাষ্ট্রদূতের

· Prothom Alo

বাংলাদেশে জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি বলেছেন, উল্লেখযোগ্য সহিংসতা ছাড়াই নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে যে রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটেছে, সেটি প্রশংসনীয়। এখন নবগঠিত সংসদ বিলম্ব না করে প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো সম্পন্ন করবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

আজ সোমবার রাজধানীর বারিধারায় জাপানি দূতাবাসে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ–জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির (ইপিএ) সুযোগ সর্বোচ্চ কাজে লাগানো’ শীর্ষক এক সেমিনারে এ কথাগুলো বলেন ঢাকায় নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত।

জাপান দূতাবাসের সহযোগিতায় এ সেমিনার আয়োজন করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।

অনুষ্ঠানে জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি বলেন, সম্প্রতি উল্লেখযোগ্য সহিংসতা ছাড়াই নির্বাচনের মাধ্যমে যে রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটেছে, সেটি প্রশংসনীয়। এটি জাতির জন্য ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অগ্রগতির একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে। বিশেষ করে সহিংসতার পরিবর্তে সমঝোতা ও সংলাপের মাধ্যমে সমাধান খোঁজার যে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। এতে বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিতেও দেশের ঝুঁকি মূল্যায়ন উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নতি হয়েছে।

সাইদা শিনিচি বলেন, ‘আমি আন্তরিকভাবে আশা করি, নবগঠিত সংসদ বিলম্ব না করে প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো সম্পন্ন করবে। এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আরও সুদৃঢ় হবে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আস্থা বৃদ্ধি পাবে।’

ইপিএ চুক্তি বাংলাদেশের জন্য বড় পদক্ষেপ

গত ৬ ফেব্রুয়ারি জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) সই করেছে বাংলাদেশ। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো কোনো দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি সই করেছে।

এই প্রসঙ্গ টেনে অনুষ্ঠানে জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি বলেন, জাপানের পক্ষ থেকে কোনো স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) সঙ্গে এটি প্রথম ইপিএ। এই চুক্তি বাংলাদেশের জন্য মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পথে একটি বড় পদক্ষেপ। এক সময় আশিয়ানভুক্ত দেশগুলোর ক্ষেত্রে এমন দেখা গিয়েছিল। একই সঙ্গে ইপিএ চুক্তি একটি উন্নত শিল্পোন্নত দেশে পরিণত হওয়ার দিকেও গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

বাংলাদেশ ক্রমেই জাপানি কোম্পানিগুলোর জন্য একটি আকর্ষণীয় বিনিয়োগ গন্তব্যে পরিণত হচ্ছে বলেন মনে করেন সাইদা শিনিচি। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত সম্ভাবনার তুলনায় বাংলাদেশে জাপানের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ খুবই সীমিত। তবে আমরা আশা করি, ইপিএ এফডিআই বাড়াতে একটি অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে। এটি ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা বাড়াবে এবং জাপানি কোম্পানিগুলোর কাছে এই ক্রমবর্ধমান বাজার সম্পর্কে নতুন আগ্রহ তৈরি করবে।

দেশে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে নতুন সরকারের ইতিবাচক বার্তা জাপানি বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করছে বলে মন্তব্য করেন জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি। তিনি বলেন, ইপিএ শুধু শুল্ক কমানোর বিষয় নয়। এর মধ্যে কাস্টমস পদ্ধতি, বাণিজ্য–সম্পর্কিত বিভিন্ন নিয়মকানুন এবং সেবা খাতের বিধানসহ বিস্তৃত নীতিমালা ও শৃঙ্খলা অন্তর্ভুক্ত থাকে। এর পূর্ণ সুফল পেতে কার্যকর বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশকে এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে শিল্পোন্নয়ন ও কাঠামোগত রূপান্তর ঘটাতে হবে, যা শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, নীতিগত সমন্বয় এবং বিনিয়োগ সহায়তার মাধ্যমে সম্ভব হবে।

‘উদ্বেগের বিষয় কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি’

অনুষ্ঠানে পৃথক চারটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য মনজুর হোসেন, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন, জাপানের ন্যাশনাল গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউট ফর পলিসি স্টাডিজের ইমেরিটাস অধ্যাপক কেনিচি ওহনো ও ব্যাংকক রিসার্চ সেন্টারের সভাপতি ইয়াসুশি উএকি।

অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে ‘বাংলাদেশে উন্নয়ন ও শিল্পনীতির পুনর্বিবেচনা’ বিষয়ে প্যানেল আলোচনায় বক্তব্য দেন লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এলএফএমইএবি) সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, বাংলাদেশে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) জ্যেষ্ঠ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ওয়াইস পারাই, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) গবেষণা পরিচালক মোহাম্মদ মাহফুজ কবির, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) অর্থনৈতিক কর্মকর্তা মো. রবিউল ইসলাম, জাইকার বাংলাদেশ অফিসের সিনিয়র রিপ্রেজেন্টেটিভ হিরোশি ইয়োশিদা ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সুলতানা ইয়াসমিন।

এলএফএমইএবি সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি আমাদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে আমরা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়াচ্ছি, ফলে কিছু খাতে কর্মসংস্থান কমছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। তাই শিল্পনীতি তৈরির সময় এই বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।’

নাসিম মঞ্জুর আরও বলেন, ‘ইতিমধ্যেই অনেক নীতি হয়েছে; অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণও রয়েছে। আর নতুন নীতির দরকার নেই। অর্থনৈতিক নীতির ক্ষেত্রে বিভিন্ন খাতের জন্য সঠিক বেঞ্চমার্ক দেশ নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সরকারি কর্মকর্তা বা বেসরকারি কোম্পানিগুলো জুতাশিল্প নিয়ে গবেষণা করতে যখন সুইজারল্যান্ডে যায়, তখন আমি বিস্মিত হই। কারণ, এটি আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক নয়।’

ধারাবাহিক প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ

দ্বিতীয় পর্বে ‘ভবিষ্যতের বাংলাদেশ–জাপান অর্থনৈতিক সহযোগিতা অন্বেষণ বিষয়ে’ প্যানেল আলোচনায় বক্তব্য দেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ, নিট পোশাকমালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ সৈয়দ ইউসুফ সাদাত, জাপান–বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (জেবিসিসিআই) সভাপতি তারেক রাফি ভূঁইয়া, জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) বাংলাদেশ কার্যালয়ের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজুইকি কাতাওকা।

বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক বলেন, বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের মানসিকতা অনেক সময় এমন যে তারা কয়েক মাস, এমনকি কয়েক সপ্তাহ বা দিনের মধ্যেই ব্যবসায়িক ফলাফল দেখতে চান। অথচ জাপানের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে ধৈর্য এবং ধারাবাহিক প্রচেষ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে আমরা সেই ধৈর্য কিছুটা হারিয়ে ফেলেছি এবং ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ঘাটতিও রয়েছে। জাপানের সঙ্গে ইপিএ আমাদের সামনে বিশাল সুযোগ এনে দিয়েছে। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক উদ্যোগ নিতে হবে।

Read at source