হাওরের বাঁধ: ‘আমরা আরম্ভ করি শেষ করি না...’

· Prothom Alo

এবারও হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হয়নি। পত্রপত্রিকা বা গণমাধ্যমে হাওরের সেখানকার কৃষকদের আশঙ্কার কথা প্রকাশিত হয়েছে। তাঁরা বলছেন, ধানের শিষ বের হওয়ার সময় চলে এসেছে। এখন যদি হঠাৎ পাহাড়ি ঢল নামে, তাহলে অসমাপ্ত বাঁধ দিয়ে পানি ঠেকানো যাবে না। সময় পার হয়ে গেলেও কাজ শেষ না হওয়ায় তাঁরা আতঙ্কে আছেন। এবারও হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নিয়ে লিখেছেন গওহার নঈম ওয়ারা

Visit asg-reflektory.pl for more information.

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোয় মোট ৩৭৩টি হাওর আছে। এর আয়তন ৮০ থেকে ৮৬ লাখ হেক্টর। এর মধ্যে বর্ষার পানি নেমে গেলে প্রায় ৬৮ লাখ হেক্টর জমি চাষের উপযোগী হয়ে ওঠে।

এই চাষযোগ্য জমির প্রায় ৮০ শতাংশে বোরো ধান এবং প্রায় ১০ শতাংশে আমন ধানের চাষ হয়। কেউ কেউ আউশ চাষেরও চেষ্টা করেন।

পানি নেমে যাওয়া আর আবার হাওর পানিতে সয়লাব হওয়ার মাঝখানে সময় থাকে বড়জোর ১৫০ দিন। পাঁচ মাস বা ১৫০ দিন পর হাওরে পানি এলে তেমন সমস্যা নেই। কিন্তু মাঝেমধ্যে এর আগেই পাহাড়ি ঢল নামে।

সেই উজানের পানি সামাল দিতেই ফসল রক্ষার বাঁধ নির্মাণ করতে হয়। নিয়ম অনুযায়ী, বাঁধের কাজ শেষ করতে হয় মার্চের আগেই, সর্বোচ্চ ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে।

এবারও হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হয়নি। পত্রপত্রিকা বা গণমাধ্যমে হাওরের কাইয়ুম মিয়া ও আছিয়া বানুদের আশঙ্কার কথা প্রকাশিত হয়েছে।

কাইয়ুম মিয়া ও আছিয়া বানুরা বলছেন, ধানের শিষ বের হওয়ার সময় চলে এসেছে। এখন যদি হঠাৎ পাহাড়ি ঢল নামে, তাহলে অসমাপ্ত বাঁধ দিয়ে পানি ঠেকানো যাবে না। সময় পার হয়ে গেলেও কাজ শেষ না হওয়ায় তাঁরা আতঙ্কে আছেন।

বাঁধের এই অবস্থা দেখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি কথা মনে পড়ে। তিনি লিখেছিলেন, ‘আমরা আরম্ভ করি শেষ করি না, আড়ম্বর করি কাজ করি না; যাহা অনুষ্ঠান করি তাহা বিশ্বাস করি না; যাহা বিশ্বাস করি, তাহা পালন করি না…পরের অনুকরণে আমাদের গর্ব, পরের অনুগ্রহে আমাদের সম্মান, পরের চক্ষে ধূলি নিক্ষেপ করিয়া আমাদের পলিটিকস।’

দেশের মোট উৎপাদিত বোরো ধানের প্রায় ৩০ শতাংশ জোগান আসে হাওর অঞ্চল থেকে। তাই হাওরের কৃষিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হয়। গবেষকেরা হাওরের ঝুঁকি মাথায় রেখে ধানের জীবনকাল কমিয়ে আনার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

বর্তমানে চালু বেশির ভাগ ধানের জীবনকাল ১৪০ থেকে ১৬০ দিন। এসব ধান সাধারণত নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে বপন করা হয় এবং এপ্রিলের দিকে কাটার উপযুক্ত হয়। কিন্তু তার আগেই যদি আকস্মিক বন্যা হয়, তাহলে বড় বিপদ দেখা দেয়। ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আকস্মিক বন্যার ২০১৭ সালের অভিজ্ঞতা এখনো মানুষের মনে তাজা। সে বছর মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে এপ্রিলের শুরুতে, বিশেষ করে ২৮ মার্চের পর, আকস্মিক পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির কারণে সুনামগঞ্জসহ সিলেটের হাওর অঞ্চলে ভয়াবহ আগাম বন্যা শুরু হয়। মার্চের ২৮ তারিখেই বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে যাওয়ার খবর আসে এবং এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত পানি দ্রুত বাড়তে থাকে। এ কারণে হাওরের বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়।

এসব দুর্যোগের কথা মাথায় রেখে এপ্রিলের আগেই ধান গোলায় তোলার উপযোগী করতে উদ্ভাবিত হয়েছে বিনা-১৭ ও ব্র্যাক ধান-২। এই দুই জাতের ধান এখন বাংলাদেশে সবচেয়ে কম সময়ে কাটার উপযোগী হয়। চারা রোপণের পর মাত্র ১০০ থেকে ১১০ দিনের মধ্যেই এই ধান কাটা যায়।

স্বল্প জীবনকালের ধান চাষের কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও কৃষকেরা ক্রমে এসব জাতের দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু ফসলের সময়কাল কমানো যত সহজ, পাহাড়ি ঢল থেকে সেই ফসল রক্ষা করা ততটাই অনিশ্চিত। ফলে ফসল রক্ষা বাঁধের ওপর নির্ভরতা কমছে না, বরং বাড়ছে।

সিলেট অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি বোরো ধান উৎপাদন হয় সুনামগঞ্জ জেলায়। এবার সেখানে ৬১২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল গত ১৫ ডিসেম্বর। এতে ছোট-বড় ১৫৪টি হাওরের বোরো ফসল রক্ষার কথা।

নীতিমালা অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দাবি করেছেন যে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। পাহাড়ি ঢল ও আগাম বন্যার ঝুঁকি থাকলেও নতুন করে ১৫ মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।

এ অবস্থায় আগাম বন্যা বা পাহাড়ি ঢলে ফসল ডুবে যাওয়ার শঙ্কায় রয়েছেন হাওরপারের কৃষকেরা। কিন্তু কাজের ধীরগতির অভিযোগ তুলেছে ‘হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও’ আন্দোলন। সংগঠনটির মুখপাত্র জানিয়েছেন, বিভিন্ন উপজেলায় প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠনে অনিয়ম হয়েছে এবং অনেক স্থানে কাজের গতি নেই।

তবে স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা মনে করেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শতভাগ কাজ সম্পন্ন হবে। জানা গেছে, সেখানে মোট ৭৮০টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে।

জেলায় বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১২৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ৬২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এবার ৬১২ কিলোমিটার বাঁধ ও ১৩৫টি প্রধান ক্লোজার নির্মাণ করা হবে।

নীতিমালা অনুযায়ী, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি তদারকির জন্য উপজেলা কমিটি, জেলা কমিটি ও উপদেষ্টা কমিটি রয়েছে। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠনে বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, কমিশন আদায় এবং নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

নীতিমালা অনুযায়ী, ৩০ নভেম্বরের মধ্যে কমিটি গঠন, ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শুরু এবং ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ করার কথা।

প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি কী

আগে পানি উন্নয়ন বোর্ড ঠিকাদারদের মাধ্যমে বাঁধ নির্মাণের কাজ করাত। কিন্তু দুর্নীতি ও বিলম্বের কারণে সরকার স্থানীয় জনগণকে দিয়ে কাজ করানোর জন্য প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি পদ্ধতি চালু করে।

প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি হলো একটি স্থানীয় কমিটি, যারা কোনো সরকারি ছোট প্রকল্প নিজেদের এলাকায় বসে সরাসরি বাস্তবায়ন করে। বাংলাদেশে, বিশেষ করে হাওরের বাঁধ নির্মাণ ও মেরামতের কাজে পানি উন্নয়ন বোর্ড এই পদ্ধতি ব্যবহার করে।

এই কমিটিতে সাধারণত ৭ থেকে ১০ জন সদস্য থাকেন। এর মধ্যে স্থানীয় কৃষক, মৎস্যজীবী, ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিনিধি, এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং কখনো কখনো স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিও থাকেন।

এই পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণের মাধ্যমে দ্রুত বাঁধের কাজ শেষ করা, খরচ কমানো এবং বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণে এলাকার মানুষকে সম্পৃক্ত করা, যাতে মানুষ নিজেরাই নিজেদের বাঁধ রক্ষা করে।

কিন্তু বাস্তবে সব সময় তা ঘটে না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রকৃত কৃষকেরা কমিটিতে থাকেন না। রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা কমিটি নিয়ন্ত্রণ করেন। কাজের মান খারাপ হয় এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। ফলে হাওরের বাঁধ নির্মাণে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি পদ্ধতি প্রায়ই সমালোচনার মুখে পড়ে।

কমিটি গঠন প্রক্রিয়া

হাওরের বাঁধ নির্মাণে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সদস্যরা সাধারণত স্থানীয় পর্যায় থেকে মনোনীত হন। এটি মূলত কমিউনিটিভিত্তিক বাস্তবায়ন ব্যবস্থা। তবে বাস্তবে নির্বাচনপ্রক্রিয়াটি অনেক সময় বিতর্কিত হয়ে ওঠে।

প্রাথমিক তালিকা তৈরির দায়িত্ব আগে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের ওপর ছিল। এখন অনেক জায়গায় চেয়ারম্যান না থাকায় প্রশাসনিক কর্মকর্তারাই এ দায়িত্ব পালন করছেন। উপজেলা কর্মকর্তারাই এখন কার্যত প্রশাসকের ভূমিকা পালন করছেন।

সাধারণত পাঁচ থেকে সাতজন সদস্য নিয়ে একটি কমিটি গঠিত হয়। এর মধ্যে স্থানীয় কৃষক বা জমির মালিক, সংশ্লিষ্ট হাওরের উপকারভোগী এবং এলাকার সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিরা থাকেন। কমিটির সদস্যদের মধ্য থেকে একজনকে সভাপতি করা হয়।

এরপর প্রস্তাবিত তালিকা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির কাছে যায়। এই কমিটির সভাপতি সাধারণত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। সদস্য হিসেবে থাকেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং কৃষি ও মৎস্য বিভাগের প্রতিনিধি। তাঁরা তালিকা অনুমোদন করলে কমিটি চূড়ান্ত হয়।

স্থানীয় সরকারব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে এখন অনেক ক্ষেত্রেই এই কমিটিগুলো প্রশাসননির্ভর হয়ে পড়েছে। গ্রেপ্তার এড়ানো বা বিভিন্ন মামলার কারণে দেশে প্রায় দেড় হাজার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান অনুপস্থিত বা পলাতক বলে জানা যায়। ফলে স্থানীয় সরকার কাঠামোর শূন্যতা মানুষের ভোগান্তি বাড়িয়েছে।

প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির ধারণার উৎস

একসময় হাওরের বাঁধ ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কেয়ার ও ব্র্যাক যুক্ত ছিল। তারা বড় বাঁধ নির্মাণের ঠিকাদার ছিল না, বরং কমিউনিটি অংশগ্রহণভিত্তিক ব্যবস্থাপনা মডেলে কাজ করত।

১৯৯০-এর দশকে সরকার ও দাতা সংস্থাগুলো মনে করেছিল যে শুধু সরকারি সংস্থার পক্ষে হাওরের বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণ করা কঠিন। তাই কিছু এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে কমিউনিটিভিত্তিক ব্যবস্থাপনা চালু করা হয়।

তাদের কাজ ছিল স্থানীয় কৃষকদের সংগঠিত করা, পানি ব্যবস্থাপনা গ্রুপ গঠন করা, বাঁধের ছোটখাটো মেরামত করা এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া। অর্থাৎ তারা মূলত সামাজিক সংগঠন ও ব্যবস্থাপনার কাজ করত, বড় প্রকৌশল কাজ নয়। ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ এই উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

এই মডেলের উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় মানুষ যেন নিজেরাই বাঁধ রক্ষা করে, দুর্নীতি কমে, দ্রুত মেরামত সম্ভব হয় এবং কৃষকদের মধ্যে মালিকানাবোধ তৈরি হয়।

অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, আগে যে কমিউনিটিভিত্তিক মডেল চালু ছিল, তা বর্তমান প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি পদ্ধতির তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর ছিল। কারণ, সেই ব্যবস্থায় প্রকৃত কমিউনিটি অংশগ্রহণ ছিল, সামাজিক জবাবদিহি ছিল, স্থানীয় জ্ঞান ব্যবহার করা হতো এবং ছোট ছোট কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা যেত।

কমিউনিটি মডেলে কাজের মান নিয়েও স্থানীয়ভাবে নজরদারি থাকত। মানুষ নিজেদের সম্পদ হিসেবে বাঁধকে দেখত। ফলে দুর্নীতির সুযোগ তুলনামূলক কম ছিল এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণও সহজ হতো।

বাঁধ-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে এবারের বিলম্বের কারণ জানতে চাইলে তাঁরা মূলত নির্বাচনকে দায়ী করছেন। বণিক বার্তা পত্রিকাকে তাঁরা জানিয়েছেন, নির্বাচনের কারণে প্রকল্পের কাজে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। নতুন করে সময় বাড়িয়ে ১৫ মার্চ পর্যন্ত করা হয়েছে এবং বর্ধিত সময়ের আগেই কাজ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। হাওরবাসী এখন সেই আশ্বাসেই নিশ্বাস নিচ্ছেন।

  • গওহার নঈম ওয়ারা লেখক গবেষক

  • [email protected]

  •  মতামত লেখকের নিজস্ব

Read at source