ভারতের বস্তিকে ‘উন্মুক্ত আকাশের শ্রেণিকক্ষ’ রূপান্তরে ১০ লাখ ডলার পেলেন যে শিক্ষক

· Prothom Alo

*বস্তিতে খোলা আকাশে শিক্ষার নতুন মডেল
*আর্টভিত্তিক শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তুলেছেন
*বস্তিতে পড়াশোনার পরিবেশ তৈরি করছেন

Visit mchezo.co.za for more information.

ভারতের মুম্বাই শহরের কোলাবা এলাকার একটি সরু গলি গিয়ে মিশেছে ছোট ছোট কংক্রিটের ঘরভর্তি এক খোলা জায়গায়, যেখানে ধোপারা শহরের কাপড় ধোয়া ও শুকানোর কাজ করেন। এলাকাটিকে ঘিরে রয়েছে উজ্জ্বল রঙে রাঙানো বস্তিঘর—লাল, নীল, সবুজ ও হলুদ, যেগুলো একটির ওপর আরেকটি বসানো, যেন বেঁকে যাওয়া টেট্রিস খেলায় জোড়া লাগানো পাজল ব্লক। এই বস্তিতে প্রধানত ধোপা ও তাঁদের পরিবারের বসবাস। তাঁদের কাজকর্মও এখানেই।

এই গোলকধাঁধার ভেতরে রয়েছে একটি ছোট শিক্ষাকেন্দ্র, যেখানে বিনা মূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা, গণিত ও ভাষা শেখানো হয়। ধোপাদের সন্তানদের প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় যুক্ত হওয়া বা স্কুল থেকে ঝরে পড়ার পর আবার ফিরে আসতে সহায়তা করে এ শিক্ষা কার্যক্রম।

এই শিক্ষাকেন্দ্রটি পরিচালনা করে একটি অলাভজনক সংস্থা, যার প্রতিষ্ঠাতা ৪৫ বছর বয়সী রুবেল নাগি। প্রায় তিন দশক শহরের সবচেয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে শিক্ষা পৌঁছে দিতে কাজ করছেন। এর স্বীকৃতিও পেয়েছেন বৈশ্বিকভাবে। মার্চের শুরুতে রুবেল নাগি গ্লোবাল টিচার প্রাইজ পেয়েছেন। এই পুরস্কারের মূল্য এক মিলিয়ন ডলার, যা ভার্কি ফাউন্ডেশন ইউনেসকোর সহযোগিতায় চালু করেছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে অসাধারণ অবদান রাখা শিক্ষকদের স্বীকৃতি দিতেই দেওয়া হয় এই পুরস্কার। এবার দেওয়া হলো দশমবার।

গ্লোবাল টিচার প্রাইজ ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ১৩৯টি দেশ থেকে আসা পাঁচ হাজার মনোনয়ন ও আবেদনকারীর মধ্য থেকে রুবেল নাগিকে সেরা নির্বাচিত করা হয়েছে।

ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, রুবেল নাগি তাঁর অলাভজনক সংস্থা—রুবেল নাগি আর্ট ফাউন্ডেশনের (আরএনএএফ) মাধ্যমে ভারতের ১০০টির বেশি সুবিধাবঞ্চিত কমিউনিটি ও গ্রামে ৮০০টির বেশি শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করেছেন। ‘লিভিং ওয়ালস অব লার্নিং’ উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা দিয়েছেন এবং এক মিলিয়নের বেশি শিশুর কাছে পৌঁছে দিয়েছেন শিক্ষার আলো। এ পুরস্কারটি বিশ্বজুড়ে ‘নোবেল অব টিচিং’ নামেও পরিচিত।

রুবেল নাগি বলেন, কম সৌভাগ্যবানদের কাছে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার অনুপ্রেরণা তিনি অপ্রত্যাশিতভাবে পেয়েছিলেন প্রায় তিন দশক আগে, যখন এক শিশু তাঁর মুম্বাইয়ের একটি আর্ট কর্মশালায় আসে। তিনি জানতে পারেন, শিশুটি একটি বস্তিতে থাকে এবং স্কুলে যাওয়ার সামর্থ্য তার নেই।

নাগি বলেন, সেই কথোপকথন তাঁকে শিশুটির বস্তি এলাকায় যেতে উদ্বুদ্ধ করে এবং তিনি দেয়ালে দেয়ালচিত্র এঁকে এলাকা সুন্দর করার প্রস্তাব দেন।

রঙের মাধ্যমে রাঙানোর স্মৃতিচারণা করে নাগি বলেন, ‘আমরা যখন দেয়াল রং করছিলাম, তখন শিশুরা জড়ো হতে শুরু করে। তাই আমি তাদের জিজ্ঞাসা করলাম, তারা কি একটি গল্প শুনতে চায়। তারা সবাই “হ্যাঁ” বলেছিল।’ তিনি বলেন, তখনই তিনি উপলব্ধি করেন যে দরিদ্র কমিউনিটির শিশুরা শিখতে চায় এবং শিল্পের মাধ্যমে তিনি তাদের শিক্ষার প্রতি আগ্রহ জাগাতে পারেন।

দক্ষিণ কোরিয়ার ইউএসটি স্কলারশিপ, প্রয়োজন আইইএলটিএস বা টোয়েফলবস্তিতে উন্মুক্ত আকাশের নিচে শিশুদের ক্লাস চলছে

বছরের পর বছর ধরে রুবেল নাগি ও তাঁর দল ভারতের বিভিন্ন শহরে শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করেছে, যেখানে শিক্ষকদের শিল্পভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে জটিল ধারণা সহজভাবে শেখাতে উৎসাহিত করা হয়। স্বেচ্ছাসেবকেরা দক্ষতাভিত্তিক পাঠদান করেন এবং অনুদানের মাধ্যমে শিশুদের বই, ব্যাগ ও অন্যান্য শিক্ষা উপকরণ দেওয়া হয়।

নাগি ব্যাখ্যা করেন, সব কেন্দ্রই ইট–কাঠের শ্রেণিকক্ষ নয়। কখনো কখনো বস্তির খোলা জায়গায় মাদুর ও কার্পেটে বসিয়ে ক্লাস নেওয়া হয়। তিনি বলেন, ‘শেখা যেকোনো জায়গায় হতে পারে। আপনাকে শুধু এটিকে আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে।’ তবে এই কেন্দ্রগুলো পরিচালনা করাও চ্যালেঞ্জিং। নাগি বলেন, ‘অনেক শিশু বিচ্ছেদ পরিবার থেকে আসে এবং তাঁর শিক্ষকদের প্রায়ই তাদের পরামর্শদাতা ও রক্ষকের ভূমিকাও পালন করতে হয়। যদি কোনো শিশু এক সপ্তাহ আমাদের কোনো কেন্দ্রে না আসে, একজন স্বেচ্ছাসেবক তার খোঁজ নিতে বাড়িতে যান।’

ভারতের মুম্বাই শহরের কোলাবা এলাকার ক্লাসরুম

নাগি আরও বলেন, শিশুদের শেখার প্রতি আগ্রহ ধরে রাখতে তিনি নিয়মিত অভিভাবকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এর ফলে তাঁর অনেক শিক্ষার্থী স্কুল শেষ করতে পেরেছে এবং কেন্দ্র ছেড়ে যাওয়ার পর কলেজ শিক্ষাও গ্রহণ করেছে।

সাবেক এক শিক্ষার্থী ময়ূর এখন নিজেই আর্ট ক্লাস চালান এবং একটি ছোট প্রিন্টিং ব্যবসা পরিচালনা করেন। সপ্তাহান্তে তিনি নাগির ফাউন্ডেশনে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন, যাতে কমিউনিটির অন্য শিশুদেরও তাঁর মতো সুযোগ দেওয়া যায়।

রুবেল নাগি বলেন, ‘এ ধরনের এলাকায় (বস্তি) কাজ করতে গেলে শুধু শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নয়, পুরো কমিউনিটির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়। কখনো অর্থসহায়তা, কঠিন সময়ে প্রয়োজনীয় জিনিস সরবরাহ বা বিপর্যস্ত কাউকে মনোযোগ দিয়ে শোনা—এসবই প্রয়োজন। আমরা যদি কমিউনিটির আস্থা ও সমর্থন অর্জন করতে পারি, তাহলে আমাদের ভালো কাজ চালিয়ে যেতে পারব।’ তিনি জানান, তাঁর ফাউন্ডেশনের ‘মিসাল’ (অর্থ ‘উদাহরণ’) প্রকল্প নিয়েও তিনি খুব আগ্রহী, যার লক্ষ্য দেয়ালে শিক্ষামূলক দেয়ালচিত্র এঁকে বিজ্ঞান, স্বাস্থ্যবিধি, পরিবেশ সচেতনতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধসহ নানা বিষয়ে বস্তিগুলোকে ‘উন্মুক্ত আকাশের শ্রেণিকক্ষে’ রূপান্তর করা।

গ্লোবাল টিচার প্রাইজ গ্রহণ করছেন রুবেল নাগি

নাগি বলেন, এসব দেয়ালচিত্র বাসিন্দাদের মধ্যে কৌতূহল সৃষ্টি করে এবং দীর্ঘ মেয়াদে মানুষের আচরণ ও মনোভাবের পরিবর্তন ঘটাতে সহায়তা করতে পারে।

পুরস্কারের অর্থ দিয়ে নাগি তাঁর ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম ভারতের আরও জায়গায় সম্প্রসারণ করতে চান, শুরু করবেন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল জম্মু ও কাশ্মীর থেকে, যেখানে তিনি বড় হয়েছেন এবং এখন একটি কম্পিউটারসমৃদ্ধ দক্ষতা ও শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তুলতে চান।

কোলাবায় গিয়ে দেখা যায়, বস্তিঘরের দেয়ালে বিশাল দেয়ালচিত্র ও অনুপ্রেরণামূলক উক্তি আঁকা। শিক্ষাকেন্দ্রের দেয়ালগুলোও উজ্জ্বল রঙে রাঙানো, যেখানে উদ্ভিদ থেকে প্রাণিজগৎ পর্যন্ত নানা বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।

কেন্দ্রটির সাত বছর বয়সী শিক্ষার্থী খুশি জানায়, সে ‘স্কুলে’ আসতে ভালোবাসে এবং বড় হয়ে শিক্ষক হতে চায়। তার মা একজন গৃহকর্মী এবং বর্তমানে পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী।

অন্যান্য অনেক শিশুও একই ধরনের আর্থিক পটভূমি থেকে এলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের বড় স্বপ্ন রয়েছে। আর নাগির স্কুলগুলো সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখার আশা করছে।

বিশ্বের শীর্ষ ১০ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় কোনগুলো

Read at source