সবার মুখ রক্ষা করে হরমুজ খোলার পথ

· Prothom Alo

৮ এপ্রিল ২০২৬ প্রথম আলোর ছাপা পত্রিকায় এ লেখা প্রকাশিত হয়েছে। যদিও এদিন বাংলাদেশ সময় ভোর রাতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছে। এরপরেও প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনায় এ লেখাটি অনলাইনে প্রকাশ করা হলো।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু করেছে, তা মধ্যপ্রাচ্যের বিদ্যমান ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যকে ভেঙে দিয়েছে। এখন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই আরেকটি মধ্যপ্রাচ্য সংকটে জড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এখন এ যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার একটি রাজনৈতিক পথ খুঁজছে।

Visit aportal.club for more information.

এ পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালির আশপাশের দেশগুলোর সামনে একটি বিরল সুযোগ এসেছে। তারা চাইলে ট্রাম্পকে একটি ‘বের হওয়ার পথ’ দেখাতে পারে। যদি এই দেশগুলো উদ্যোগ নিয়ে হরমুজ প্রণালির জন্য নিজেদের নিয়ন্ত্রণে একটি নতুন নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলে, তাহলে তারা আঞ্চলিক রাজনীতি ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নিজেদের গুরুত্ব আরও বাড়াতে পারবে।

অন্যদিকে যদি এই সুযোগ কাজে লাগানো না হয়, তাহলে দীর্ঘ যুদ্ধ চলতে থাকবে এবং শেষ পর্যন্ত ইরান একতরফাভাবে নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা চাপিয়ে দেবে। গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলভুক্ত (জিসিসি) দেশগুলো এখন দুই দিক থেকে চাপে আছে। একদিকে তারা যদি ট্রাম্পের বিরোধিতা করে (বিশেষ করে যুদ্ধের সময়), তাহলে বড় ধরনের ঝুঁকি ও অনিশ্চিত প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়তে পারে। এর কারণ ট্রাম্পকে অনেকেই অনিশ্চিত আচরণের নেতা হিসেবে দেখেন।

স্বল্প মেয়াদে এ উদ্যোগ হরমুজ প্রণালি আবার চালু করতে সাহায্য করতে পারে এবং ট্রাম্পকে যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার সুযোগ দিতে পারে। এতে ট্রাম্প বলতে পারবেন, তাঁর মিত্রদেশগুলো প্রণালি খুলে দিয়েছে।

অন্যদিকে তারা যদি চুপ থাকে, তাহলে ইরান তাদের এই যুদ্ধের নীরব অংশীদার হিসেবে দেখতে পারে। এতে তারা ইরানের সামরিক কৌশলের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। ইরান এখন এমন এক নীতি অনুসরণ করছে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের যুদ্ধ আর না ঘটে এবং সে কারণে আগেভাগেই শক্ত অবস্থান নিচ্ছে।

এ পরিস্থিতি আরও একটি বিষয় পরিষ্কার করে। সেটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাছাতার সীমাবদ্ধতা আছে। বিশেষ করে এখন, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ক এতটাই ঘনিষ্ঠ যে অনেক ক্ষেত্রে ইসরায়েলের স্বার্থই এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। ফলে তাদের মধ্যকার বর্তমানের এ সম্পর্ক টেকসই হবে না।

ইরানের হাতে এখন বড় ধরনের কৌশলগত ক্ষমতা রয়েছে। তারা মাত্র ২০ হাজার ডলারের ড্রোন ব্যবহার করে সমুদ্রপথের চলাচল বন্ধ করে দিতে পারে। এসব ড্রোন ভূগর্ভে তৈরি করা যায় এবং দেশের যেকোনো জায়গা থেকে ব্যবহার করা সম্ভব। ইরানের কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে বলেছেন, তাঁরা এই সক্ষমতা ব্যবহার করে হরমুজে নতুন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চান।

ইরান ইতিমধ্যেই পুরোনো ব্যবস্থাকে ভেঙে দিতে শুরু করেছে। তবে নতুন ব্যবস্থা শুধু ইরানের ইচ্ছায় গড়ে উঠতে হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

ভবিষ্যতের পথ খুঁজতে ইউরোপের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। নেপোলিয়নের যুদ্ধের পর ইউরোপে স্থিতিশীলতা আনার জন্য ‘কংগ্রেস অব ভিয়েনা’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপ ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একীভূত হয়। এগুলো হুবহু অনুসরণ করার জন্য নয়, বরং অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখা যেতে পারে।

হরমুজ প্রণালির একটি বড় সমস্যা হলো এটি এখনো একটি সুস্পষ্ট আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর আওতায় নেই। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম, কিন্তু এর জন্য আলাদা কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি নেই।

এ পরিস্থিতিতে ‘কংগ্রেস ফর হরমুজ’ নামে একটি উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এর মাধ্যমে আঞ্চলিক দেশগুলো একসঙ্গে বসে একটি নিরাপত্তাকাঠামো তৈরি করতে পারবে; আইনি শূন্যতা পূরণ করতে পারবে এবং নিজেদের অঞ্চল ও বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারবে। এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হবে একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি তৈরি করা, যা হরমুজ প্রণালির অবস্থান ও ব্যবস্থাপনাকে আইনি ভিত্তি দেবে। একই সঙ্গে এটি নিশ্চিত করবে যে হরমুজের নিয়ন্ত্রণ স্থানীয় দেশগুলোর হাতেই থাকবে এবং তাদের বৈশ্বিক গুরুত্ব আরও বাড়বে।

স্বল্প মেয়াদে এ উদ্যোগ হরমুজ প্রণালি আবার চালু করতে সাহায্য করতে পারে এবং ট্রাম্পকে যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার সুযোগ দিতে পারে। এতে ট্রাম্প বলতে পারবেন, তাঁর মিত্রদেশগুলো প্রণালি খুলে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা উচিত এই অঞ্চলের দেশগুলোর। এর ভবিষ্যৎ বাইরের পরাশক্তিগুলোর নির্ধারণ করা ঠিক হবে না, যারা এত দিন নিজেদের স্বার্থে এ অঞ্চল ব্যবহার করেছে এবং এখনো তা অস্থিতিশীল করছে।

  • ড. সিনা এমামি আধুনিক ইরানের ইতিহাস ও রাজনীতি নিয়ে গবেষণা করেন

    আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

Read at source