যুদ্ধ যেভাবে ইরানকে নতুন বিশ্বশক্তি করে তুলছে
· Prothom Alo

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভূরাজনীতির প্রচলিত ধারণা ছিল এই যে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা তিনটি পরাশক্তিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। এই তিনটি কেন্দ্র হলো যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া। এই ধারণার মূল ভিত্তি ছিল সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অর্থনীতির আকার ও সামরিক সক্ষমতা। কিন্তু সেই পুরোনো ধারণা এখন আর খাটছে না। বিশ্বে দ্রুতগতিতে চতুর্থ একটি বৈশ্বিক পরাশক্তির উত্থান ঘটছে, সেটি হলো ইরান।
যদিও অর্থনৈতিক বা সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে ইরান বাকি তিন পরাশক্তির সমকক্ষ নয়, তবু দেশটির নতুন এই ক্ষমতার উৎস হলো বিশ্ব অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড বলে পরিচিত হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের একক নিয়ন্ত্রণ।
Visit rouesnews.click for more information.
দীর্ঘকাল ধরে হরমুজ প্রণালি একটি আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, যেখান দিয়ে বিশ্বের সব দেশের জাহাজ নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারত। তবে এ বছর ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে গেছে। ইরান এখন এই প্রণালিতে বেছে বেছে নির্দিষ্ট কিছু দেশের ওপর সামরিক অবরোধ বা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেখানো একটি উড়োজাহাজের ধ্বংসাবশেষ। ইরানের দাবি, মার্কিন উদ্ধার অভিযানের সময় এই উড়োজাহাজটি ধ্বংস করা হয়বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। নিকট ভবিষ্যতে এই সরবরাহ রুটের কোনো বিকল্প নেই বললেই চলে। আমার আশঙ্কা হলো হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের এই নিয়ন্ত্রণ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের ওপর মারাত্মক আঘাত হানবে এবং পুরো বিশ্বব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে গড়ে তুলবে।
অনেক বিশ্লেষকই মনে করেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের এই আধিপত্য সাময়িক। তাদের প্রত্যাশা হলো যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের নৌবাহিনী শিগগিরই পরিস্থিতি শান্ত করবে এবং তেল সরবরাহ আবার আগের মতো স্বাভাবিক হবে। কিন্তু এই প্রত্যাশায় বড় ধরনের গলদ আছে।
অনেকেই মনে করেন, হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে হলে ইরানকে সেটি পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হবে। কিন্তু আমরা এরই মধ্যে দেখেছি যে নৌপথ বন্ধ না করেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব। বর্তমানে তেলবাহী জাহাজের জন্য পথটি খোলা থাকলেও যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জাহাজ চলাচল প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র এখন এক মহাসংকটে পড়েছে। হয় তাকে দীর্ঘকালীন ও রক্তাক্ত এক যুদ্ধে জড়িয়ে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করতে হবে, অথবা জ্বালানির এই নতুন ব্যবস্থাটি মাথা পেতে মেনে নিতে হবে, যেখানে তার একক রাজত্ব থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্র যদি যুদ্ধের পথ বেছে নেয়, তাতে দীর্ঘ সংগ্রামের পরও জয় অনিশ্চিত।
কারণ, ইরানি হামলার ঝুঁকির কথা ভেবে বিমা কোম্পানিগুলো হয় তাদের নিরাপত্তার চুক্তি বাতিল করেছে অথবা বিমার কিস্তি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কয়েক দিন পরপর একটি জাহাজে চোরাগোপ্তা হামলা করাই এই রুটকে অকেজো করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
আধুনিক অর্থনীতিতে কেবল তেলের সরবরাহ থাকলেই হয় না, সেই সরবরাহ হতে হয় সময়মতো ও নির্ভরযোগ্য। যখন সেই নির্ভরযোগ্যতার ভিত্তিই ভেঙে পড়ে, তখন পণ্য পরিবহনের খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। তখন সরকারগুলো জ্বালানি প্রাপ্তিকে নিছক বাজারের লেনদেন হিসেবে না দেখে একটি জাতীয় কৌশলগত সংকট হিসেবে বিবেচনা করতে বাধ্য হয়।
ইরান যুদ্ধে আদৌ কি কেউ বিজয়ী হবে!এখানে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মূল সমস্যা হলো এক অসম লড়াই। হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করা প্রতিটি তেলবাহী জাহাজকে মাইন, ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে রক্ষা করা একটি পূর্ণকালীন যুদ্ধ করার সমান। এর জন্য সেখানে নিয়মিত সামরিক নৌবহরের টহল প্রয়োজন। অন্যদিকে বিশ্ব তেলের বাজারে সংশয় ও ভীতি তৈরির জন্য ইরানের মাঝেমধ্যে একটি মাত্র জাহাজে আঘাত করাই যথেষ্ট।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ গত বৃহস্পতিবার বলেছেন যে শক্তি প্রয়োগ করে হরমুজ প্রণালি সচল করার চিন্তা বাস্তবসম্মত নয়। বরং ইরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেই এর সমাধান খুঁজতে হবে। এটি মূলত একটি বড় ধরনের স্বীকারোক্তি। কারণ, তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ইরানের সম্মতি ছাড়া অদূর ভবিষ্যতে সম্ভব নয়।
কয়েক দশক ধরে পারস্য উপসাগরের ভূরাজনীতি ছিল অতি সরল। দেশগুলো তেল রপ্তানি করত, মুক্তবাজার দাম ঠিক করত এবং যুক্তরাষ্ট্র সেই যাতায়াত পথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করত। সেই ব্যবস্থা এখন তছনছ হয়ে গেছে। তেলের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো এখন সংকটের মুখোমুখি। জ্বালানি অনিশ্চয়তার কারণে তেলের বাজার ও সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে বাধ্য।
ইরান যুদ্ধে কি তাহলে মার্কিন পরাশক্তির পতন ঘটতে যাচ্ছে?মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো অগত্যা এমন এক শক্তির সঙ্গে সমঝোতা করতে আগ্রহী হবে, যাদের তেলের বাজার অস্থির করার সরাসরি ক্ষমতা রয়েছে, আর সেই শক্তি হচ্ছে ইরান।
এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে এশীয় দেশগুলোর ওপর। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত ও বাংলাদেশ জ্বালানির জন্য চরমভাবে পারস্য উপসাগরের ওপর নির্ভরশীল। এমনকি চীনও তাদের প্রয়োজনীয় জ্বালানির বড় একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। এই অবকাঠামোগত নির্ভরতা এতই গভীর যে চাইলেই চটজলদি এর কোনো বিকল্প বের করা সম্ভব নয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতি ও বিনিময় হারের ঝুঁকি প্রতিটি রাষ্ট্রকে নতুনভাবে হিসাব করতে শেখাবে। আর এতে সুবিধা পাবে ইরান।
জ্বালানির বিশাল প্রবৃদ্ধির প্রয়োজনে চীন ইরানের ওপর নির্ভর করবে। রাশিয়া চাইবে জ্বালানির বাজার অস্থির থাকুক। এই বিষয়গুলোই কিন্তু আমেরিকার বৈশ্বিক স্বার্থের সরাসরি বিরোধী। অথচ চীন, রাশিয়া ও ইরানের স্বার্থ রক্ষার জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক চুক্তির প্রয়োজন হচ্ছে না, স্রেফ বৈশ্বিক বাস্তবতাই তাদের এক সুতোয় গেঁথে ফেলছে।
মৃত্যু–উপত্যকার মুখে আবারও কি ‘ভুল’ করছে পেন্টাগনএকটু চিন্তা করে দেখুন, যখন ২০ শতাংশ তেলের নিয়ন্ত্রণ থাকবে ইরানের কাছে আর ১১ শতাংশ থাকবে রাশিয়ার কাছে, তখন তারা তেলের একটি বিশাল জোট বা কার্টেল গঠন করে পশ্চিমা দেশগুলোকে একরকম জিম্মি করে ফেলতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ব কর্তৃত্ব খর্ব হবে এবং পাল্লা সরাসরি ঝুঁকে যাবে বেইজিং ও মস্কোর দিকে।
যুক্তরাষ্ট্র এখন এক মহাসংকটে পড়েছে। হয় তাকে দীর্ঘকালীন ও রক্তাক্ত এক যুদ্ধে জড়িয়ে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করতে হবে, অথবা জ্বালানির এই নতুন ব্যবস্থাটি মাথা পেতে মেনে নিতে হবে, যেখানে তার একক রাজত্ব থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্র যদি যুদ্ধের পথ বেছে নেয়, তাতে দীর্ঘ সংগ্রামের পরও জয় অনিশ্চিত। আর যদি মেনে নেয়, তবে ইরান নিশ্চিতভাবে একটি পরাশক্তি হিসেবে নিজের আসন স্থায়ী করে নেবে।
ইরানে হামলা ও ইসরায়েলি বিলবোর্ডের ‘বারো ভাইয়া’ইরান পরিস্থিতি এখন কেবল একটি সাময়িক সামরিক উত্তেজনায় সীমাবদ্ধ নেই। এটি বিশ্ব ক্ষমতার কেন্দ্র পরিবর্তনের একটি নতুন মোড়। যুদ্ধের দামামা চলুক বা থামুক, হরমুজ প্রণালি কর্তৃত্ব হাতছাড়া হওয়া মানেই বিশ্বব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন ঘটে যাওয়া। দশকের পর দশক যে সাজানো দুনিয়া আমরা দেখে এসেছি, এই রূপান্তর চলতে থাকলে হয়তো আগামী কয়েক বছরের মধ্যে তার রূপ চিরতরে বদলে যাবে।
ড. রবার্ট পেপ শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক
নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত