বাঙালি বীরের জাতি, গণতন্ত্র থাকলে দেশ ধীরে ধীরে উন্নতি করবেই

· Prothom Alo

হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম—এই বীর মুক্তিযোদ্ধা জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো অনুষ্ঠানের এবারের আয়োজনে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক। ১০ মার্চ ২০২৬ দেওয়া দীর্ঘ এই সাক্ষাৎকারে নিজের শৈশব–কৈশোর থেকে শুরু করে সামরিক জীবন, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ ও দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেছেন তিনি।

ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো অনুষ্ঠানে আপনাদের সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি। আজ আমরা এসেছি হাফিজ উদ্দিন আহমদ আহমদ বীর বিক্রমের কাছে। তিনি একজন বিখ্যাত ফুটবল খেলোয়াড়। পূর্ব পাকিস্তানে দৌড়বিদ হিসেবে চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা, রাজনীতিবিদ, সাতবারের নির্বাচিত এমপি। স্যার, আপনাকে আমাদের এই বিশেষ অনুষ্ঠানে স্বাগত জানাই।

Visit palladian.co.za for more information.

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: আমাকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য ধন্যবাদ।

আমরা এই অনুষ্ঠানে শৈশব থেকেই শুরু করি। আমি দেখলাম যে ১৯৪৪ সালের ২৯ অক্টোবর আপনার জন্ম। এটা ঠিক আছে?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: জি, ঠিক আছে।

তাহলে আপনার বয়স তো ৮১ প্লাস, ৮২–এর দিকে যাচ্ছেন এবং আপনার জীবন তো অভিজ্ঞতাময়। আপনার সুন্দর একটা বই আমার হাতে আছে—‘সৈনিক জীবন: গৌরবের একাত্তর, রক্তাক্ত পচাত্তর’। আপনি সুন্দর করে লিখেছেন আপনার ছোটবেলায় দেখা বরিশাল, সেই পামগাছ, কৃষ্ণচূড়া, নদীতীর। আপনার জন্ম কি বরিশাল শহরেই হলো?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: আমার জন্ম ভোলার লালমোহনে।

ওটাই তো আপনার নির্বাচনী এলাকা?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: এটাই আমার নির্বাচিত এলাকা। এখানেই আমার জন্ম, ১৯৪৪ সালে।

আপনি তাহলে বরিশাল শহরে কেন এলেন?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: আমার বাবা ছিলেন একজন প্র্যাকটিসিং ডাক্তার—আজহারউদ্দিন আহমদ। তিনি বরিশাল শহরে প্র্যাকটিস করতেন। সেই সুবাদেই বরিশালেই আমার বেড়ে ওঠা। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে আমি বরিশাল শহরে।

বরিশালে প্রাইমারি স্কুল কোনটা?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: বরিশাল জিলা স্কুল। সেখান থেকে বিএম কলেজে ইন্টারমিডিয়েট, তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ভর্তি হলাম। পড়াশোনায় কম মনোযোগ দিয়েছি। তবু মোটামুটি উতরে গিয়েছি পড়াশোনায়।

আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন কত সালে?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: ১৯৬১ সালে। অনার্স করি ১৯৬৪ সালে, মাস্টার্স ১৯৬৫তে।

আপনি যে ফুটবলে দারুণ, দৌড়ে ভালো—এটা বরিশালে থাকতেই কি জানতেন? নিশ্চয়ই খেলতে তো পছন্দ করতেনই?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: বরিশালে ফুটবল, ক্রিকেট খেলতাম। অ্যাথলেটিকসে ঝোঁকের মাথায় ঢাকায় আসার পরই অংশগ্রহণ করি। ফজলুল হক হলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হচ্ছিল। সেখানে আমি কেডস পরেই নাম দিলাম ১০০ মিটার দৌড়ে। এ প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়ার পর মাঠে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাথলেটিকস কোচ আমেরিকান ওটিস্কোপি। তিনি আমাকে বললেন, আমি নাকি পূর্ব পাকিস্তানের রেকর্ড ভঙ্গ করেছি।

ওহ, টাইমের দিকে দেখা গেল যে...

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: টাইম দেখে বললেন এবং তিনি বললেন যে আর এক সপ্তাহ পরই প্রাদেশিক প্রতিযোগিতা হবে পূর্ব পাকিস্তানে। সব জেলা– ইউনিভার্সিটি মিলিয়ে সেখানে আমাকে নামতে হবে। আমি বললাম, আমি তো অ্যাথলেট নই, ফুটবলার। আমার রানিং শু পর্যন্ত নেই। উনি বললেন, ‘তুমি এখনই চলো।’ তাঁর জিপে তুলে স্টেডিয়ামে নিয়ে গেলেন। সেখানে একটা দোকান থেকে রানিং শু কিনে দিলেন। সেটা পরে এক সপ্তাহ পর প্রাদেশিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করলাম এবং ১০০, ২০০ মিটার দৌড়ে প্রথম হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলাম—১৯৬৪, ’৬৫ এবং ’৬৬—এই তিন বছরই অ্যাথলেট ছিলাম। ১০০, ২০০ মিটার দৌড়ে ভালো করেছিলাম, প্রথম হয়েছিলাম।

আপনি ফুটবলে একদম অল পাকিস্তান ন্যাশনাল টিমে চান্স পেলেন, আপনি আর প্রতাপ হাজরা—দুজন?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: জি।

জাতীয় সংসদে স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ

আপনি পাকিস্তানের ন্যাশনাল টিমে খেললেন ফুটবলার হিসেবে। অ্যাথলেট হিসেবেও বিখ্যাত বা সফল; দৌড়ে পূর্ব পাকিস্তান চ্যাম্পিয়ন। এটা কীভাবে টের পেলেন যে, আপনি ফুটবলেও অনেক ভালো?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: ফুটবল আমার নেশা। স্কুল–কলেজজীবন থেকে খেলছি এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ফুটবলারদের খুব নামডাক। অ্যাথলেট বা ক্রিকেটারদের কেউ চিনত না। সে জন্য যশের কাঙাল আমি ফুটবলেই নামলাম। তখন টেলিভিশনও ছিল না, যে সময় আমরা শুরু করি। কিন্তু তখন দুটি বিখ্যাত টিম ছিল—ওয়ান্ডারার্স আর মোহামেডান স্পোর্টিং। আমি প্রথমে ছোট টিম দিয়ে শুরু করি, পরে মোহামেডানে খেলি। মোহামেডানের খেলোয়াড় হিসেবে যখন স্টেডিয়াম এরিয়ায় বা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখানে–ওখানে যেতাম, পেছনে পেছনে একটা গুণমুগ্ধ ভক্তের দল থাকত। ‘এই যে মোহামেডানের হাফিজ যায়’, এগুলোই আমাদের জন্য তখনকার দিনের বড় তারকা। তখনকার দিনে এটাই আমাদের জন্য আকর্ষণ। টেলিভিশন ছিল না, ক্রিকেট এত জনপ্রিয় হয়নি তখনো।

রেডিওতে ধারাবিবরণী দিত মনে হয়?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: রেডিওতে খেলার ধারাবিবরণী দিত, টেলিভিশনে ছিল না। রেডিওতে আবদুল হামিদ আর মনজুর হাসান মিন্টু ভাই ধারাবিবরণী দিতেন। তবে আর্মিতে যাওয়ার আগে আমি মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে খেলেছি এবং জাতীয় দলেও খেলেছি। আর্মিতে যাওয়ার আগেই জাতীয় দলে প্রথম সুযোগ পাই। ১৯৬৭ সালে সৌদি আরবের টিম এসেছিল খেলতে, তারা পশ্চিম পাকিস্তানেই চারটি ম্যাচ খেলে। এই টিমে আমরা দুজন বাঙালি ছিলাম—প্রতাপ শংকর হাজরা ও আমি।

আপনারা তখন ন্যাশনাল টিমে খেলতে ঢাকা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে গেলেন?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: হ্যাঁ। ন্যাশনাল টিমে সিলেকশনের জন্য প্রায় ৪৪ জন খেলোয়াড়কে ডাকত। প্রতি পজিশনে চারজন করে খেলোয়াড়। ১৯৬৭ সালে নভেম্বরের দিকে এশিয়ান কাপ খেলার জন্য পাকিস্তান দল রেঙ্গুনে যায়। তখনকার বার্মা, এখনকার মিয়ানমার—এই দলে আমি একাই বাঙালি ছিলাম। সেখানে আমরা তিনটি ম্যাচ খেলি। তারপর ঢাকায় ফিরে এসে আরসিডি টুর্নামেন্ট। …ইরান, তুরস্ক ও পাকিস্তান—তিন দলের মধ্যে। ঢাকা স্টেডিয়ামে একে তো আমি পরিচিত, মোহামেডানের উত্তর দিকে তো মোহামেডানেরই সব সমর্থক; যখন আমার পায়ে বল আসত, তখনই পুরো স্টেডিয়াম হইহই হইহই করে উঠত। কারণ, আমি একমাত্র বাঙালি। আমার চেয়ে ভালো খেলোয়াড় টিমে ছিল এশিয়ান মানের দুই–তিনজন। আমার ক্লাবেই খেলত তোরাব আলী বলে একজন স্টপার ব্যাক। পুরোনোরা চিনবেন তাঁকে। … আমরা থাকতাম শাহবাগ হোটেলে। তিনটা টিম থাকত। এখন যেটা পিজি হসপিটাল, সেখানে প্লেয়াররা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা–তামাশা করত যে ‘ভাই, আমরা তো কোনো প্লেয়ারই না, তুমিই একমাত্র প্লেয়ার। তোমার পায়ে বল গেলে লাফায়। আমরা গোল দিলেও হাততালি পড়ে না।’ এটার কারণ হলো, তখন ওই যে পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে একটা মানসিক দূরত্ব হয়ে গিয়েছিল—বাঙালি–অবাঙালি—সেটারই প্রতিফলন ছিল এই খেলার মাঠে।

তারপর আপনি আর্মিতে গেলেন, ’৬৮ সালে?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: আর্মিতে গেলাম ’৬৮ সালের মার্চে এবং ওই বছরই ডিসেম্বরে–নভেম্বরে কমিশন পেলাম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। সেখানেই প্রথম দেখলাম মেজর জিয়াউর রহমানকে। তিনি আমাদের একজন ইন্সট্রাক্টর ছিলেন।

সেটা তো পাকিস্তানে অ্যাবোটাবাদ কাকুলে?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: অ্যাবোটাবাদের পাশেই তিন মাইল দূরে একটা ছোট্ট এলাকা, যার নাম কাকুল, সেখানে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি।

সেখানে ফুটবল মাঠে উনি রেফারি ছিলেন?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: ইন্সট্রাক্টররা ক্যাডেটদের সঙ্গে খেলে বিভিন্ন জায়গায়। …হাফ প্যান্ট আর সাদা স্পোর্টস শার্ট পরা সানগ্লাস লাগানো রেফারি আমাকে ডাকলেন হুইসেল বাজিয়ে। আমি কাছে গেলাম। তিনি বললেন, ‘মাই নেম ইজ জিয়া।’ তারপর আমাকে জিজ্ঞেস করলেন যে আমি বিশ্ববিদ্যালয় দলে খেলেছি কি না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দলে খেলেছি কি না। আমি ভাবলাম, বলি যে আমি জাতীয় দলের খেলোয়াড়। ইরান–টার্কিতে খেলে এসেছি। ক্যাডেটরা আবার বেশি কথা বললে বিপদ হওয়ার আশঙ্কা আছে। বকা খেতে পারি।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান: জন্ম: ১৯ জানুয়ারি ১৯৩৬, মৃত্যু: ৩০ মে ১৯৮১

আপনাকে যে নির্দিষ্ট প্রশ্ন করেছে, আপনি নির্দিষ্ট উত্তর দিলেন?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: বললাম, ‘জি স্যার। খেলেছি, বিশ্ববিদ্যালয় দলে খেলেছি।’…পরে আরেকটা কোর্সে যখন পাসিং আউট হয়, তখন তিনি (জিয়াউর রহমান) আমাকে ডাকলেন। ক্যাডেটদের মধ্যে যে ফার্স্ট পজিশনে থাকে, তাকে ব্যাটালিয়ন সিনিয়র আন্ডার অফিসার (বিএসইউ) বলে। তিনি বললেন, ‘এই বিএসইউ, কাম হিয়ার।’ আমি গিয়ে অ্যাটেনশন স্যালুট–ট্যালুট দিলাম। বলেন যে, ‘কিছুদিন পর তোমরা পাস আউট করবে। তোমরা ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যাবে। তুমি আমার ব্যাটালিয়নে ফুটবল টিমে যেমন ভালো করেছ, তেমনি আমরা যুদ্ধে অনেক নাম করেছি ’৬৫–এর ওয়ারে। আর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে বাঙালিদের ভবিষ্যৎ তুমি। ইউ উইল গো অ্যান্ড জয়েন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট।’

আপনি বললেন, ‘রাইট স্যার।’

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: রাইট স্যার, বলে চলে আমি এলাম। খুব ইমপ্রেসড হয়ে গেলাম যে আমাকে ডেকে এ রকম কথা বললেন এবং তাঁর নির্দেশ মেনেই আমি চয়েজ দিলাম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যাওয়ার জন্য। হুইচ ওয়াজ গ্র্যান্টেড এবং এভাবে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে এলাম। এই সুবাদে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছি। এই হলো পাকিস্তান আর্মিতে আমার ইতিবৃত্ত।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে আপনার পোস্টিং যশোরে ছিল?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: জি।

তারপর আপনার বইয়ে আপনি লিখেছেন যে ২৫ মার্চের আগে আগে আপনাদের সীমান্তে পাঠিয়ে দেওয়া হলো?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: জি।

ফলে ২৫ মার্চ কী হলো; ২৬ মার্চ, ২৭ মার্চ—এগুলো আপনারা জানতেন না?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: কিছুই জানতাম না। আর আমি ঢাকায় এসেছি, মানে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এসেছি ১৬ মার্চ। ফলে এই যে মার্চের গোড়ার দিকে গণ–আন্দোলন, ২ তারিখে পতাকা উত্তোলন, ৭ তারিখে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ ইত্যাদি শোনার সুযোগ হয়নি। ১৬ তারিখে এসেছি। তবে জনগণ যে ক্ষুব্ধ, এটা বুঝতে পেরেছি এবং পার্লামেন্টের অধিবেশন যে পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে, এ জন্য বাঙালিরা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ, এটা অনুভব করছি। তবে আসার পর সঙ্গে সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় যাওয়ার ফলে বন্ধুবান্ধব বা কারও সঙ্গে আলাপসালাপের সুযোগ নেই। আমরা সামরিক বাহিনীর সেই কষ্টকর ট্রেনিং এক্সারসাইজগুলো সীমান্ত এলাকায় দিন নেই–রাত নেই হাঁটাহাঁটি করছি, আক্রমণ, রক্ষণ ইত্যাদি যুদ্ধের নানা কলাকৌশল সৈনিকদের নিয়ে রপ্ত করছি। শীতকালীন ট্রেনিং এক্সারসাইজ বলে এটাকে। এভাবে ২৯ তারিখ পর্যন্ত ছিলাম। ইতিমধ্যে ২৫ তারিখে যে একটা ক্র্যাকডাউন হয়েছে, এটা সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। মেজর জিয়াউর রহমান ২৬ তারিখে এবং পরে ২৭ তারিখে বেতার থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন, এসব কিছুই জানতাম না। ২৯ তারিখে আমাদের ডেকে পাঠানো হলো ক্যান্টনমেন্টে। …হেঁটে গভীর রাতে ১২টার দিকে আমরা ক্যান্টনমেন্টে এলাম। আসার পরে আমরা যার যার অফিসার মেসে গিয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে গিয়েছি। পরদিন সকালে সাড়ে সাতটার দিকে ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার দুররানি এলেন এবং নির্দেশ দিলেন—প্রথম ইস্ট বেঙ্গল আমার ব্যাটালিয়নকে নিরস্ত্র করা হলো। এর কারণ হলো, ইতিমধ্যেই দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল জয়দেবপুরে, তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল সৈয়দপুরে, চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল কুমিল্লাতে এবং অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল চট্টগ্রামে বিদ্রোহ করেছে। …যেহেতু অন্যদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই, সর্বশেষ যখনই আমাদের ব্রিগেড কমান্ডার এসে নিরস্ত্র করলেন, সঙ্গে সঙ্গে আমরা সৈনিকেরা সবাই ক্ষুব্ধ হয়ে অস্ত্রাগার ভাঙি। ওই সময় একটা বিদ্রোহ হলো। কারণ সবাই ভেবেছে, এর (দুররানি) উদ্দেশ্য খুব খারাপ, এই সময় আমাদের কেন অস্ত্র কেড়ে নেওয়া হবে আর এমনিতে তো ক্ষোভ আছেই। তখন ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে আট ঘণ্টাব্যাপী একটি যুদ্ধ হয়। এখানে আমার কমান্ডিং অফিসার বাঙালি ছিলেন, লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেজাউল জলিল। আমি তাঁর কাছে গিয়ে বললাম, ‘স্যার, আমরা কি করব?’ উনি স্মার্ট অফিসার। আমেরিকায় কোর্সটোর্স করে এসেছেন। আমরা খুব ভয় পেতাম তাঁকে; কিন্তু দেখা গেল যে ওই সংকট মুহূর্তে উনি সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পারলেন না এবং অবিরল ধারায় অশ্রু নির্গত হচ্ছে। তাঁর কান্না দেখে আমি অবাক। বয়স্ক লোক, কাঁদছেন। গোলাগুলি চলছে, মর্টারে গোলা ফেলছে—এ সময় তো সৈনিকের রিঅ্যাকশন হবে যে লেট আস ফাইট ইট আউট বা তারা গুলি ছুড়লে আমরা একটা গুলি ছুড়ব—সেই জায়গায় কান্নাকাটি, এটা তো আর্মির ভোকাবুলারিতে পড়ে না। যখন দেখলাম যে উনি কিছু করছেন না, পরে আমি বাইরে আসার পর সৈনিকেরা আমাকে বলল, ‘স্যার, একজন অফিসার দরকার। আমরা বিদ্রোহ করেছি, আপনি আমাদের নেতৃত্ব দেন।’ আমি বললাম যে কমান্ডিং অফিসার বাঙালি, তাঁর কাছে যান। বলে, ‘ওনাকে বলেছিলাম, কিন্তু উনার বয়স হয়েছে। বিদ্রোহ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।’ তাঁর পরই আমি সিনিয়র। আড়াই বছর চাকরির। আমি বললাম, ‘ঠিক আছে, আমি আছি তো। আমি দুই–এক মিনিট চিন্তা করেছি একটা থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে—গুলি চলছে তখন—যে আমি এই পাঁচজন অফিসারের সঙ্গেই অফিস রুমে বসে থাকব নাকি বাইরে যুদ্ধরত সৈনিকদের সঙ্গে যোগ দেব। মিনিট দুই চিন্তা করে ভাবলাম, সৈনিকদের সঙ্গেই থাকা ভালো। তখন ব্যাচেলর ছিলাম। কোনো পিছুটান ছিল না। সৈনিকদের সঙ্গে যুদ্ধে লেগে গেলাম। একজন বাঙালি সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট ছিল—আনোয়ার হোসেন। তাঁকে আমি ইশারা করে বাইরে ডেকে নিয়ে এলাম। বললাম যে ‘আমি তো বিদ্রোহীদের সঙ্গে আছি, তুমি কী করবে?’ আনোয়ার হোসেন বলে, ‘আমিও আছি আপনাদের সঙ্গে।’ ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের ইয়াং ছেলে। খুবই সাহসী। যুদ্ধের একপর্যায়ে তিনি শহীদ হন।

মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট আনোয়ার

মার্চ মাসেই শহীদ হলেন?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: ওই দিনই এ ঘটনা ঘটেছে। ৩০ মার্চ আট ঘণ্টাব্যাপী যে যুদ্ধটি হয়, এই যুদ্ধের শেষ দিকে আমরা যখন চলে আসি। আমাদের যেহেতু পরিকল্পিত বিদ্রোহ না, … আমরা মর্টারের মতো ভারী অস্ত্র বের করতে পারিনি। আরও কিছু অস্ত্র বের করতে পারিনি, জাস্ট পদাতিক বাহিনীর টিপিক্যাল অস্ত্র, মেশিনগান আর রাইফেল নিয়ে আমরা বের হয়েছি। যুদ্ধের একপর্যায়ে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট আনোয়ার হোসেন—মাত্র ছয় মাস চাকরি—শহীদ হন।

তিনি শহীদ হওয়ার পর আপনারা কি ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে গেলেন?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে গেলাম। সেখান থেকে এক হাজার গজ দূরেই একটা গ্রাম আছে, তার নাম খিতিবদিয়া। ওই গ্রামে প্রবেশ করে দেখি, হাজার হাজার লোক দা, খুন্তা, কুড়াল লাঠিসোটা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তারা আমাদের জড়িয়ে ধরল, ‘আল্লাহু আকবর’, ‘জয় বাংলা’ বলল। তারপর গাছ থেকে ডাব পেড়ে খাওয়াল, মুড়ি–মুড়কি খাওয়াল। ছাত্ররা বলল, ‘স্যার, অস্ত্র দিন, যুদ্ধ করব।’ ওই দৃশ্য, ওই যে দৃশ্য আমার জীবনের একটা স্মরণীয় দৃশ্য। এই বাঙালিকে ‘ভেতো বাঙালি’ বলে পাকিস্তানিরা হাসত, মশকরা করত। এরা নন মার্শাল রেস। এই যে হাজার হাজার লোক বলছে, ‘অস্ত্র দেন, যুদ্ধ করব,’ যুদ্ধ মানে তো জীবন দেওয়া।

এমনিতে ওই সব জায়গা মানে চুয়াডাঙ্গা, যশোর, কুষ্টিয়া তো অনেক দিন পর্যন্ত স্বাধীনই ছিল?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: জি।

তারপর পাকিস্তানি সৈন্যরা ওইটা পুনরুদ্ধার করে?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: পাকিস্তানি সৈন্যরা প্রথমে ভয়ে ক্যান্টনমেন্টে ছিল। প্রথম ভয় ছিল যে ভারতীয়রা ঢুকে আক্রমণ করে কি না। দ্বিতীয়টা হলো, বেঙ্গল রেজিমেন্ট ইপিআরের হাজার হাজার বাঙালি এসে তাদের কী করে। এসব আতঙ্কে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে আত্মরক্ষা করতে পাকিস্তানি সৈন্যরা প্রথমে ক্যান্টনমেন্টের ভেতরেই ছিল। পরে ধীরে ধীরে পাকিস্তান থেকে আরও সৈন্য এল, আরও রসদ এল; আরেকটু শক্তিশালী হয়ে সৈন্যরা বাইরে এসে বাঙালি দমনে লিপ্ত হলো। ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিল, গ্রাম পুড়িয়ে দিল। বহু মানুষকে হত্যা করল। এপ্রিল মাসে যশোর থেকে বিদ্রোহ করার এক সপ্তাহ পর আমি বেনাপোল এলাকায় যাই। বেনাপোল থেকে ছয় মাইল উত্তরে যশোরের দিকে কাগজপুকুর বলে একটা জায়গায় ডিফেন্স নিই। আমার সাথে বিদ্রোহ করে এসেছিল ২০০ বাঙালি সৈনিক। আর সেখানে ইপিআরের ছিল ২০০। এই ৪০০ সৈনিককে নিয়ে আমি একটা রক্ষণব্যূহ গড়ে তুলি এবং এপ্রিল–মে দুই মাস পাকিস্তানিদের ওখানে ঠেকিয়ে রাখি। ওরা প্রতিদিন আক্রমণ করত, আমরা প্রতিদিন প্রতিরোধ করতাম। আমরা একটু সুবিধাজনক জায়গায় থাকায় আক্রমণগুলোকে প্রতিহত করতে সক্ষম হতাম।

১৭ এপ্রিল বৈদ্যনাথতলায় মুজিবনগরে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদের যে মুজিবনগর সরকার গঠিত হলো, সেখানে কি আপনি গিয়ে পৌঁছাতে পেরেছিলেন?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: ঘটনাক্রমে আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম এবং সেখানেই দেখা হয় আমাদের প্রধান সেনাপতি কর্নেল ওসমানীর সাথে। তাঁর সাথে আমার পূর্বপরিচয় ছিল। সারা বাংলাদেশের এমপিএ প্রাদেশিক পরিষদ ও জাতীয় পরিষদের সদস্যদের মধ্যে আমার অনেক সহপাঠী, বন্ধুবান্ধবও ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের বন্ধুদের সাথেও দেখা হলো। সেখানেই বাংলাদেশ সরকার গঠিত হলো। তাজউদ্দীন সাহেব চমৎকার একটা ভাষণ দিলেন; বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষায়ই। মঞ্চের পাশেই একটা চেয়ারে আমরা চারজন বসে ছিলাম। সেই দৃশ্য এখনো আমার চোখে ভাসে। জায়গাটা খুব সুন্দর ছিল। মেহেরপুরের আম্রকাননের কিছু দূরেই পলাশীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। আবার নতুন সূর্য উদিত হওয়ার দৃশ্য দেখতে পেলাম।

আরেক আম্রকাননে?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: আরেক আম্রকাননে।

এরপর তো নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ। আপনাদের অনেকেই শহীদ হলেন, আহত হলেন, যুদ্ধ করলেন, বীর হলেন। বিস্তারিত বলতে গেলে অনেক সময় লাগবে; আমরা কামালপুর যুদ্ধ নিয়ে একটু শুনি আপনার কাছে।

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: কামালপুর যুদ্ধ হলো জুলাইয়ের ৩১ তারিখে। মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ আক্রমণ এবং বলতে গেলে একমাত্র প্রথাগত বা কনভেনশনাল অ্যাটাক।

পাকিস্তানি আর্মিদের ওখানকার প্রতিরোধ নাকি খুব শক্তিশালী ছিল?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: পাকিস্তানি আর্মি খুব শক্তিশালী ছিল। তাদের সিমেন্টের বাঙ্কার ছিল। বালুচ রেজিমেন্টের একটা কোম্পানি আর প্রায় দেড় শ সৈনিক ছিল। তাদের কাছে কামানও ছিল। ইচ্ছা করলেই তারা কামানের গোলা ফেলতে পারত। আর্মির পরিভাষায় এটাকে স্ট্রং পয়েন্ট বলে। তারা মাইন ফিল্ড বিছিয়ে রেখেছিল। এ ধরনের স্ট্রং পয়েন্টে আক্রমণ করতে হলে কামানের সাহায্য দরকার। কিন্তু আমাদের কোনো আর্টিলারি ছিল না।

এ কারণে এই আক্রমণে আমরা আক্রমণ করার পর হতাহত হয়েছি। আমার বন্ধু ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন মমতাজ শহীদ হলেন। এ যুদ্ধে আমিও আহত হয়েছি।

আপনার গুলি লেগেছিল?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: মর্টারের স্প্লিন্টার। কামানের গোলার স্প্লিন্টার শরীরে আটটা জায়গায় লেগেছিল। আমি অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছি। একপর্যায়ে যখন কামানের গোলার সাথে পড়ে আমি ডাইভ করলাম, হঠাৎ দেখি যে আমার হাতে যে সাব মেশিনগান ছিল, ওইটার বাঁটটা কেটে নিয়ে গেছে অর্থাৎ দুই ইঞ্চি এদিকে থাকলে আমাকে দ্বিখণ্ডিত করতে পারত। এটা যে কতটা সাংঘাতিক। আরেকটা ঘটনা মনে পড়ে। আধুনিক যুদ্ধ তো বেতার সেটের মাধ্যমে পরিচালিত হয়; আমরা যখন মাইন ফিল্ডের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি, তখন আমার বেতার সেটটা ছিল একজন সোলজারের পেছনে। হ্যান্ডসেটটা আমার কাছে বা ওই অফিসারের কাছে থাকে। আমরা দুজন একদম পাশাপাশি ছিলাম। ছয় ইঞ্চিও দূরত্ব নেই এবং গা ঘেঁষে ঘেঁষে যাচ্ছি। তার পিঠে সেটটা আর আমি কথা বলছি অন্য কমান্ডারদের সাথে। মাইন ফিল্ডের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ দেখি, সেটটা যে বহন করছে, ওর নিচের থেকে অর্ধেক উড়ে গেল ওই মাইনের মধ্যে। ওই মাইনে পড়ে গেল, মানে ছয় ইঞ্চি এদিকে থাকলে আমিও ওইটার ভেতর পড়ে যেতাম। আমারও একই অবস্থা হতো। অলৌকিকভাবে বেঁচে গেলাম আরকি! যার ভাগ্যে যা আছে, হায়াত আছে হয়তো! এইভাবে আমরা এই কামালপুরের কিছুটা অংশ দখল করেছিলাম। কামালপুর ছিল জামালপুর জেলার সবচেয়ে উত্তরের একটা বর্ডার আউটপোস্ট। তার কিছুটা অংশ আমরা দুজন অফিসার মিলে দখল করেছিলাম। দুই কমান্ডার এই আক্রমণের নেতৃত্ব দিয়েছি। একজন শহীদ হলেন আর আমি আহত হলাম। ফলে আমাদের পুল আউট করতে হলো। এই আক্রমণটা করেছে যারা, সেই ২৫০ জনের মধ্যে ২০০ জনই ছাত্র। তাদের এক মাস মাত্র ট্রেনিং দিয়েছি আমরা তেলঢালায়। আর ৫০ জন আমার আগের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে ছিল। এসব স্বল্পশিক্ষিত তরুণ এ ধরনের আক্রমণে জয় লাভ করা আর্টিলারি সাপোর্ট ছাড়া! … আমি ’৭৩ সালে একটা কোর্স করার জন্য ইংল্যান্ডে গিয়েছিলাম, তাদের স্টাফ কলেজে। যেহেতু আমার কমব্যাট এক্সপেরিয়েন্স আছে, ইন্সট্রাক্টররা জিজ্ঞেস করতেন, ‘আচ্ছা, যুদ্ধের মাঠে এটা কী হয়?...এই পরিস্থিতিতে কী হয়? তোমার কি অভিজ্ঞতা?’ আমি তখন কামালপুর অপারেশনের কথা বলতাম। ওরা অবাক বিস্ময়ে খালি শুনত এবং পরে বলত যে কোনো পেশাদার বাহিনীর পক্ষে এ ধরনের আক্রমণ করা সম্ভব নয়। একমাত্র যারা মুক্তিযোদ্ধা বা সুইসাইড স্কোয়াড, যারা জীবন দিতে এসেছে দেশের জন্য, তারাই পারে এ ধরনের আক্রমণে অংশগ্রহণ করতে। এসব কথা শুনে গর্বে বুকটা ভরে উঠত। এটা খুব স্মরণীয় একটা ঘটনা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের। সবচেয়ে অবাক লাগে যে আমরা তো এই দেশেই বড় হয়েছি, আশপাশের স্কুল–কলেজের ছাত্রদের দেখে অভ্যস্ত; সাধারণ মানুষ দেখে অভ্যস্ত। কিন্তু একাত্তরে অন্য একটা জাতি আমাদের চোখের সামনে। মানে দুঃসাহসী ইয়াং ছেলে, গ্রামের স্কুলে নাইন–টেনে পড়ে বা ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে, পরনে লুঙ্গি, গায়ে একটা গেঞ্জি, খালি পা, এসে বলে, ‘স্যার, অস্ত্র দেন, যুদ্ধ করব।’ একটা জায়গায় একটা ইউথ ক্যাম্পে, আমার ব্যাটালিয়নের জন্য ৬০০ ছাত্র রিক্রুট করতে গেছি, সেইখানে এক হাজার ছেলে এক মাস ধরে কুমড়া আর লাউ খাচ্ছে। পোকা, গন্ধওয়ালা ডাল একবেলা খাচ্ছে; অপেক্ষা করছে; লেফট–রাইট করছে যে কবে একটা অস্ত্র পাবে, কবে যুদ্ধ করবে। আমরা যখন ওখানে গিয়ে ছেলেদের বাছাই করতাম, আর্মি বানানোর জন্য নিচ্ছি, সুতরাং পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি উচ্চতা দরকার; একটু লম্বা তো দরকারই। কিন্তু অধিকাংশ বাঙালি তো অত লম্বা হয় না। ১০০ জনের মধ্য থেকে যখন ২০ জনকে নিলাম, বাকি ৮০ জন বাদ পড়ে গেল। তাদের কান্না, ‘আমাদের কেন নেবেন না?’ এবং কিছু কিছু শিক্ষিত ছেলে বলে, ‘আপনি তো রেগুলার আর্মির জন্য নিচ্ছেন না। আপনি তো মুক্তিযোদ্ধা বাছাই করছেন। আপনি হাইট দিয়ে আমাদের মাপেন কেন? আপনি শত্রুর একটা বাংকার দেন। আমাদের হাতে গ্রেনেড দেন আর শত্রুর বাংকারটা দেখিয়ে দেন। যে বাংকারে গিয়ে শত্রুর আড্ডায় এই গ্রেনেড ফেলে আসতে পারবে, তাকে আপনি রিক্রুট করবেন।’ আমি দেখলাম, কথা তো ঠিকই। যা–ই হোক, ওরা বুঝেশুনে জিপের সামনে শুয়ে পড়ত, ‘না, আমাদের না নিয়ে যেতে পারবেন না।’

আমরা যখন ভোরের কাগজে কাজ করি, তখন জিয়াউর রহমান বলেছিলেন যে এই ব্যাটেল ফিল্ডে তিনি আর আপনি পাশাপাশি ছিলেন। এটা কি সিলেটের দিকে নাকি?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: একটা ঘটনা হলো জকিগঞ্জের গৌরীপুরে পাকিস্তান আর্মির ৩১ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট আমাদের ওপর আক্রমণ করে। আমরা সেখানে ডিফেন্সে ছিলাম। গৌরীপুরে এই আক্রমণে ওদের ৮০ জন নিহত হয়। তাদের কমান্ডার মেজর সারোয়ার নিহত হয় এবং ৩২ জনকে আমরা জীবিত বন্দী করি। সে ছিল পাঞ্জাবি সোলজার। চার ঘণ্টাব্যাপী যুদ্ধ হয়। একপর্যায়ে দেখি, মেজর জিয়াউর রহমান আমার ট্রেঞ্চের মধ্যে এলেন। বসলেন। সে সময় আমাদের যুদ্ধে ভারতীয়রা অংশগ্রহণ করেছে। আমরা কামানের গোলা ফেলতে পারতাম। কামানের গোলা ফেলে বেতার সেটে মেসেজ দিলে ওই ম্যাপ দেখে আমি যদি বলি, ওয়ান টু থ্রি নাইন ওয়ান সিক্স, এটা বললে ওই আর্টিলারি অফিসার সেটা ম্যাপে দেখতে পারে। মানে এই ফিগার দেওয়ায় একটা জায়গা সে লোকেট করতে পারে। আমার তখন বলতে হয় যে শত্রুর ওপর ফায়ার করো। ওয়ান রাউন্ড গানফায়ার। আমার পাশে একটা কোম্পানি, তার কমান্ডার ছিল ক্যাপ্টেন মাহবুবুর রহমান। মাহবুব শত্রুর ওপরে এই ফিগার দিয়ে বলছে, ওয়ান রাউন্ড গান ফায়ার। প্রতিটি কামানে ছয়টা গোলা থাকে। ওয়ান রাউন্ড গান ফায়ার মানে প্রতিটি গান ছয়টা গোলা ফেলবে। তো গোলাটা ছোড়ার পরে পাকিস্তানি শত্রুর ওপরে পড়ে। পাঞ্জাব রেজিমেন্টের ওপরে পড়ার পর মাহবুব উৎসাহে খুব খুশি। শত্রুর ওপরে গোলা পড়েছে, ইনফ্যান্ট্রি কমান্ডারের জন্য খুব আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা। সে খুশিতে চিৎকার করে বলছে, ‘ওয়েল ডান! ওয়েল ডান! অন টার্গেট! রিপিট ফায়ার।’ মানে, ‘আবার ছয়টা গোলা ফায়ার করো।’ এ সময় পাকিস্তানিরা একটামাত্র গোলা ফায়ার করছে। আমরা তো অনেক গোলা ইতিমধ্যে ফায়ার করেছি। গোলা শর্টেজ থাকে পাকিস্তানিদের। ওদের আমদানি করতে হয়। আর ভারতীয়রা গোলা নিজেরাই উৎপাদন করে। তো, পাকিস্তানিরা একটা গোলা করেছে, ওইটাই মাহবুবের কাছে এসে পড়ল। আর সে ওখানেই ডেড! মাহবুব মাহবুব, ও–ই যে শত্রু, একটামাত্র গোলা ফায়ার! এই মুহূর্তে যে চিৎকার করছে, ওয়েল ডান, অন টার্গেট, পরের মুহূর্তে সে–ই ওদের টার্গেট হয়ে গেল।

শহীদ হয়ে গেলেন?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: শহীদ হয়ে গেল এবং বেতার সেটে দেখি, কোনো শব্দ নাই। সেই আর্টিলারি অফিসার জিজ্ঞেস করছে, ‘এবার যে গোলা ফেললাম, এটার রেজাল্ট কী?’ ওরা বলে, রিপোর্ট। রিপোর্ট। কিন্তু মাহবুবের তো কোনো জবাব নাই। আমি ভাবলাম, সেটে কোনো গোলমাল হলো কি না! আমিও ওই একই নেটে থাকি। মাহবুবের কল সাইন ছিল ওয়ান, আমার ছিল টু। আমি বললাম, ‘হ্যালো টু ফর ওয়ান, রিপোর্ট সিচুয়েশন টু ফর ওয়ান, রিপোর্ট সিচুয়েশন!’ আমার খুব কাছের বন্ধু ছিল। দিনাজপুরে বাড়ি। যুদ্ধ এমনই একটা ভয়াবহ অভিজ্ঞতা, এই মুহূর্তে যে খুশি, যে শত্রু নিধন করেছে, পরমুহূর্তে সেই শত্রুই তাকে নিধন করে। এক সেকেন্ডের ব্যবধান বাঁচা আর মরার মধ্যে।

বলতে পারি, এটাই আমার শেষ সাক্ষাৎকার

আর জিয়াউর রহমান যে আপনার...

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: আর জিয়াউর রহমান এখানে পাশে বসা। বেতার সেটে তো সবাই শুনতে পায়। আমি তাঁকে বললাম, ‘স্যার, আপনি এখানে কেন? পেছনে যান।’ তিনি বললেন, ‘না। তোমরা এখানে জীবন দিচ্ছ, কত আর পেছনে থাকা যায়?’ এটাকে উর্দুতে ওরা বলত গায়রাত বা আত্মসম্মানবোধ যে এইভাবে মুক্তিযোদ্ধারা জীবন দিচ্ছে, আমার ব্যাটালিয়নে তিনজন অফিসার মারা গেছে, ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন, ক্যাপ্টেন মাহবুব আর প্রথম দিনই লেফটেন্যান্ট আনোয়ার। এইভাবে জিয়ার সাথে যুদ্ধের এই প্রসঙ্গ। এরপর মজা হলো যে ওই যুদ্ধের পর পাকিস্তানিদের মনোবল ভেঙে যায়। তারা সিলেটের দিকে পশ্চাৎপসারণ শুরু করে। তখন আমরা ঠিক করলাম যে সিলেটে সবার আগে পৌঁছাতে হবে। আমরাও তাদের ধাওয়া করব। তো আমরা ম্যাপের ভেতর রুট বেছে নিলাম। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই হাওর ও চা–বাগানের ভেতর দিয়ে সিলেটে যাওয়ার একটা রুট ঠিক করে আমরা রওনা দিলাম। আমরা ছিলাম ১২০০ সৈনিক। চিড়া, গুড়, শুকনা খাবার আমাদের পিঠে ব্যাকে, হ্যাভারসেকে। মেজর জিয়াউর রহমানও আমাদের সাথে। আমরা রওনা দিলাম চা–বাগানের ভেতর দিয়ে। তিন দিন পর খাবার শেষ। চতুর্থ দিনে অভুক্ত আমরা। কিন্তু দেখলাম যে জঙ্গল আস্তে আস্তে ফাঁকা হচ্ছে এবং ১৪ তারিখ সকালে সামনে দেখলাম একটা সাদা ভবন। সিলেটে আগে কখনো যাইনি। পরে জানলাম যে ওটা হলো এমসি কলেজের প্রিন্সিপালের বাসা। উঁচু টিলার ওপরে ওই বাসার চারদিকে বাংকার। পাকিস্তানিদের একটা ঘাঁটি, রেয়ার এলিমেন্ট। আমরা চা–বাগানের ভেতর দিয়ে আসছি যখন ১৪ ডিসেম্বর সকালে যুদ্ধ চলছে। সিলেট থেকে আট মাইল দূরে খাদিমনগরে। পাকিস্তানিরা কল্পনা করেনি যে শহরের মধ্যে মুক্তিবাহিনী ঢুকে যেতে পারে। সকাল হওয়ার পর ওরা রোদ পোহানোর জন্য বাংকার থেকে বেরিয়ে এসেছে। বের হয়ে এসে দেখে, ৩০০ গজ দূরে আরেক টিলার ওপর আমরা। চিৎকার করে আমাদের পরিচয় জানতে চায় যে আমরা কারা। আমরা তো জবাব দিই না। বরং তাড়াতাড়ি ট্রেঞ্চ খোঁড়ার কাজে লিপ্ত হলাম। ওরা ততক্ষণে বুঝে গেছে। আধা ঘণ্টার মধ্যেই ওরা আক্রমণ শুরু করল আমাদের ওপর এবং আমার কোম্পানির ওপরেই আক্রমণটা এল। আমরা যেহেতু ট্রেঞ্চ খুঁড়তে পারিনি, আমাদের প্রতিরোধ ছিল অসম্পূর্ণ। সে জন্য ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আমার ১৮ জন সৈনিক শহীদ হলো এবং আমার একজন প্লাটুন কমান্ডার সুবেদার ফয়েজ বীর উত্তম শহীদ হলেন। আমিও মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করে আছি।

১৪ ডিসেম্বরে?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: ১৪ ডিসেম্বরে আমাদের সঙ্গে একজন ভারতীয় মেজর ছিলেন একটা বেতার সেটসহ। চা–বাগানের মধ্যে বেতার সেট কাজ করেনি। এখন যেহেতু চা–বাগান থেকে অনেকটা বেরিয়ে আসছি, ওই সময় তিনি তিনটার দিকে আমাকে বললেন যে আমি এখন আমার গান পজিশনে যোগাযোগ করতে পারছি, কামানের গোলা ফেলব কি না। আমি বললাম যে এখন আমরা হাতাহাতি যুদ্ধে লিপ্ত। এই সময় যদি কামানের গোলা ফেলেন, আমাদের ওপর পড়তে পারে। আমি তাঁকে বললাম যে আপনি দেখেন একটা বিমান আক্রমণ করা যায় কি না। আধা ঘণ্টা পরে দুইটা মিগ বিমান ভারতীয়দের— ওরা এসে এই যে যতগুলা বাংকার, এগুলাকে ১৫ মিনিট ধরে রকেট মেরে একদম তছনছ করে উড়িয়ে দিল। বিমানের শব্দ খুব ভয়ংকর যখন লো ফ্লাই করে, তারপর রকেটের শব্দ। তখন পাকিস্তানিরা সাদা পতাকা উড়িয়ে দিল, সারেন্ডার করল। এভাবে ৩০ মার্চ বিদ্রোহের যে সূচনা, ১৪ ডিসেম্বর সিলেট এমসি কলেজের এই আক্রমণের ফলে এই যুদ্ধে আমরা সফল হই এবং বাংলাদেশের তখন ১৮টা জেলা ছিল। একটা মাত্র জেলা মুক্তিবাহিনী একক প্রচেষ্টায় দখল করেছে, সেটা হলো সিলেট জেলা এবং এই আক্রমণে আমি নেতৃত্ব দিয়েছিলাম। আমাকে জিয়াউর রহমান এই আক্রমণের জন্য বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবের জন্য রিকমেন্ড করেছিলেন।

খেলোয়াড়ি জীবনে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আপনাকে জাতীয় ফুটবল দলে নেয়নি কেন? কারণ, আপনি মোহামেডান?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম দুই ম্যাচে ৭ গোল দিলাম, তখন মোহামেডানের হয়ে দুই ম্যাচে ৭ গোল। তার পরে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের টিম মালয়েশিয়ায় গেল, আমাকে বাদ।

আমার অপরাধ হলো আমার ফাদার পাকিস্তান আমলে জাতীয় পরিষদ সদস্য ছিলেন। ডাক্তার হয়েও ’৭৩ সালে উনি শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন ভোলায়। … শেখ সাহেব ঢাকায় চারটা আসন আর ভোলার ওই আসন—পাঁচটা আসনে দাঁড়ালেন এবং যেদিন মনোনয়নপত্র জমা দিতে হয়, তার আগের দিন তাঁকে হাইজ্যাক করে নিয়ে গেল আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা। পরের দিন আবার দিয়ে গেল, তখন এক দিনই জমা দেওয়া যেত এবং সাবডিভিশন হেডকোয়ার্টারে গিয়ে জমা দিতে হতো। এই যে আমার ফাদার যে আসন থেকে দাঁড়িয়েছে, এটাই বড় অপরাধ। তাঁর সময় এই ঘটনা যখন ঘটে, আমি তখন ট্রেনিংয়ে ইংল্যান্ডে।

ওই জন্য আপনাকে ফুটবল টিমে নিল না?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: নিলই না। অথচ তো আমি ফর্মে আছি। ডাবল হ্যাটট্রিক করছি। প্রথম ম্যাচেই এগুলো আরকি … যে দেশ আমরা সৃষ্টি করলাম, সেই দেশের …একটা ফুটবল টিম খেলতে যাবে, প্রথম বাংলাদেশ ন্যাশনাল টিম। লাস্ট ম্যাচ পাকিস্তান যেটা খেলল, তিনজন বাঙালি ছিলাম আমরা, সেই টিমে তেহরানে ওটাতে আমি ক্যাপ্টেন ছিলাম। এই হলো বাংলাদেশ তো অনেক কিছুই ঠিক করতে পারে না। আমরা জাতি হিসেবে অনেক দুর্বল এবং পশ্চাৎপদ জাতি।

তারপর ’৭৫–এর ১৫ আগস্টে চলে আসি। আপনার বইয়ে বিস্তারিত বর্ণনা আছে। এর মধ্যে একটা হচ্ছে যে ১৫ আগস্টের পরে বঙ্গবন্ধুর সপরিবার নিহত হয়ে তাঁদের লাশ ওখানে পড়ে আছে। ওই দিনই আপনি ৩২ নম্বরে ঢুকেছিলেন?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: ওই দিনই, হ্যাঁ আমাকে বঙ্গভবনে ডাকা হলো। আমি ঢাকায়। তখন আর্মি খুব ছোট ছিল। পাঁচটা ক্যান্টনমেন্টে পাঁচটা ব্রিগেড। ব্রিগেড মানে অ্যাবাউট ৪০০০ সৈনিকের মতো, তো দুপুরবেলা আমাকে বঙ্গভবন থেকে সিজিএস ব্রিগেডিয়ার খালেদ বললেন যে, তুমি আসো এখানে বঙ্গভবন ডিফেন্সের জন্য, সেনা মোতায়েন করতে হবে। আমাকে পরামর্শ করার জন্য যেতে বললেন। আমি যাওয়ার সময় ভাবলাম যে অবিশ্বাস্য যে এত বড় নেতা এভাবে সত্যি সত্যি হলো কি না আমি ভাবলাম। একটু দেখে আসি তো। ৩২ নম্বরে গেলাম, জীবনে এই দ্বিতীয়বার। আরেকবার কী জন্য যেন গিয়েছিলাম ওইখানে। ওইখানে মেজর বজলুল হুদা ছিল, সে আমাকে রিসিভ করল এবং নিয়ে গেল তো দোতলায় উঠতে দোতলায় ওঠার পথে সিঁড়ির ওপরে দেখলাম তাঁর ডেড বডি সাদা চাদরে মোড়ানো। একদম ইয়ে মানে মনে হয় ঘুমিয়ে আছে আরকি। চেহারায় আর কোনো রক্তের দাগটাগ কিছু নাই। সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা আরকি। পরে ওইটা দেখে আমি ফিরে এসে তারপর গেলাম বঙ্গভবনে আর বঙ্গভবনে যেটা দেখলাম যে তার যে পুরা মন্ত্রিসভা, সবাই সেখানে রেডি, শপথ পড়ল।

সৎ মানুষের নেতৃত্ব দরকার, তারা যেন দেশটাকে এগিয়ে নেয়

হ্যাঁ, মানে আওয়ামী লীগের লোকজনই আবার মন্ত্রী হয়ে গেল?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: সবাই সেইম ক্যাবিনেট মোশতাক তো তার মানে যে মন্ত্রী ছিলেন, পুরো মন্ত্রিসভার সবাই মন্ত্রী হলো। শুধু এই চার নেতা বাদে। এই চার নেতার দুইজন জেলে ছিল, তখন এই চার নেতা বাদে সবাই এটা।

আর ওই ৩২ নম্বরে একজন সৈনিক ছিলেন, আপনি বলছিলেন উনি বলে যে চাবি কাকে দেব?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: ও সেটা হলো ৩২ নম্বরের আগে। আমি তো প্রেসিডেন্ট যে কোথায় থাকে, তা–ও জানতাম না। আমি ভাবলাম যাওয়ার পথে ওই যে গণভবন পড়ে, তো ওইটাই তো প্রেসিডেন্টের জন্য বানিয়েছিল। আমি ভাবলাম যে ওইখানে আছে নাকি দেখি। ওইটার মধ্যে ঢুকলাম। প্রেসিডেন্ট যে ৩২ নম্বরে থাকে, এ তো আমরা জানি না। আমরা জুনিয়র অফিসাররা আর্মি আর ফুটবল নিয়ে আছি। কে কোথায় থাকে জানি না। তো ওখানে ঢুকলাম। ঢুকে দেখি যে যশোরে আমার কোম্পানিরই একজন জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার বলে সুবেদার সে ওখানে চাবির গোছা নিয়ে হাজির। সে ওই গণভবনে কন্ট্রোলার। এসব চাবিটাবি লজিস্টিকের অনেক কিছু অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের, তার দায়িত্ব আরকি সে এই হত্যাকাণ্ডে মানে এত নার্ভাস হয়ে গেছে আমাকে আইসা খালি চাবি জমা দিতে চায় যে এগুলা আপনি বুঝে নেন আমার কাছ থেকে। আমি বলি কী জন্য। আমি বললাম এখানে কে কে আছে, বলল এখানে কেউ নেই। শুধু একজন ব্রিগেডিয়ার। মিলিটারি সেক্রেটারি ব্রিগেডিয়ার মাশরুরুল হক খুব সিনিয়র অফিসার। আমাদের উনি বন্দী আছে তো ওখানে ভেতরে গিয়ে দেখলাম যে মাটিতে বসে আছে গুটিসুটি। আমাদের সিনিয়র অফিসার তাকে যে আমি স্যালুট ট্যালুট করে তাঁকে সাহস দিলাম, তারপর একটা গাড়ি এনে তাঁকে পাঠিয়ে দিলাম।

…আপনি বললেন কেউ নাই আপনি এখানে বসে আছেন কেন?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: হ্যাঁ, বলে আমি তো বন্দী। আমি বলি কে বন্দী, কোনো গার্ড নেই কিছু নেই কিসের বন্দী আপনি। মানে বাসায় যাবেন তো একটা গাড়ি এনে তাঁকে পাঠিয়ে দিলাম আরকি।

আপনার রাজনীতিতে আসি। আপনি জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচন করেছেন প্রথম?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: ১৯৭৮ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়া আমাকে ডাকলেন। এই আমরা যাঁরা রিটায়ার হয়েছিলাম ’৭৫ সালে, আমাদের বেশ কয়েকজনকে উনি ডাকলেন।

আচ্ছা, আপনাকে আর্মি থেকে বাধ্যতামূলক রিটায়ারমেন্ট দেওয়া হয়েছে?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: ’৭৬ সালের মার্চে দেওয়ার পরে আমরা যারা অধিকাংশ প্রায় সবাই মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম, তো জিয়া আমাদেরকে ডাকলেন যে আমরা একটা পার্টি করছি। তোমরা এখান থেকে ইলেকশন করো। তো আমি বললাম যে আমি রাজনীতি করব না। আমি তখনো ফুটবল খেলি। আমি বলছি, আমি এখনো ফুটবল খেলি, আমার টাকাপয়সাও নেই, ইলেকশন, রাজনীতি আমার ভালো লাগে না বলে আমি চলে আসলাম। আমার সঙ্গে আরও দুজন গিয়েছিলেন। একজন হলো আমার স্ত্রীর বড় ভাই মেজর ইকবাল, আরেকজন হলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা লেফটেন্যান্ট কর্নেল জাফর ইমাম। তাঁরা দুজন গেলেন। তাঁদের দুজনকে জিয়াউর রহমান মন্ত্রী বানালেন। আমার তখন এই মোটা বুদ্ধির কারণে বুঝতে পারিনি যে প্রেসিডেন্টের আহ্বানে সাড়া দেওয়া উচিত ছিল।… কয়েক দিন পরে দেখি যে জাফর ইমাম আর ইকবাল ফ্লাগ লাগায়ে ঘুরছে আর আমি হাফপ্যান্ট পরে স্টেডিয়ামে ফুটবল খেলছি। তারপর আরও ১০ বছর চলে গেল। আমার রাজনীতিতে কোনো আগ্রহ নেই। ’৮৬ সালে আমার সেনাবাহিনীতে যারা বন্ধুবান্ধব পরিচিত, তারা তখন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এই পর্যায়ে তারা বলে আমরা একটা পার্টি বানাচ্ছি, আর্মি বলে আমরা একটা পার্টি বানাচ্ছি। তুমি ইলেকশন করলে করো। তোমার বাবা তো এমপি ছিলেন। আমি বললাম ঠিক আছে, রিটায়ার্ড মেজর ঘুরে বেড়াচ্ছি। ঠিক আছে যাই ইলেকশন করি। তো ইলেকশন করলাম। সহজেই জিতলাম। আব্বার যেটা কনস্টিটিউয়েন্সি ছিল, সেটা জাতীয় পার্টির থেকে। প্রথমবার করলাম পার্টি টার্টিতে তখনো যোগ দিইনি বা পার্টি ছিল না। এটা হলো আর্মির একটা সিভিলিয়ান উইং ছিল। এই জাতীয় পার্টি ওইখান থেকে ওই টাকাপয়সাও আর্মি দিত। …ওইটা আরকি নাথিং পলিটিক্যাল অ্যাবাউট ইট। তো তখন তো মাঠে ছিল আওয়ামী লীগ আর জাতীয় পার্টি। আমি ভাবলাম, আমি রিটায়ার্ড আর্মির অফিসার আর্মির পার্টিতেই যাই। সেই হিসেবে ইলেকশন করলাম। সেই পার্লামেন্ট টিকল এক বছর। সব দল এটাতে অংশগ্রহণ করছে। বিএনপি ছাড়া আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, প্রত্যেকটা দল। এক বছরের পরে কী কারণ হলো, এটা ভেঙে গেল। তারপর ’৮৮ সালে একটা নির্বাচন হলো। এটাতে কোনো দল অংশগ্রহণ করেনি। ওইটা আবার দুই বছর টিকে গেছে। তারপরও এরশাদ ওইটা দুই বছর টিকিয়ে রেখেছেন। তো আমি ওইটাও যেহেতু করলাম, প্রথমবার এমপি হয়ে আমি এর সঙ্গে সঙ্গে আগে দূর থেকে দেখছি, তেমন একটা পরিচয় ছিল না। চিনি, কোনো কথাবার্তাও কোনো দিন বলিনি। ইলেকশনের পরে আমি খালি এরশাদের সঙ্গে দেখা করব। দলের চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করা দরকার। উনি এই যে তিন বছরের মতো ছিলাম, কোনো দিনই আমার সঙ্গে দেখা করেননি। একটা অ্যাপয়েন্টমেন্টও দিতেন না। তাঁর এমএসপি মেজর জেনারেল মনজুর রশিদ খান আমাকে বললেন যে আপনার সঙ্গে দেখা করবেন না। আমি বললাম, তবু দেখি চেষ্টা তো করতে হবে। এমপি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করব। কোনো দিন দেখাও করেননি এবং ওই এমপি হিসেবেই রয়ে গেলাম। আর কিছুদিন পরে যখন বুঝলাম যে আর দেখা করবেন না, তার চেষ্টাও করিনি। ভোলায় একটা মিটিংয়ে গেলেন এরশাদ। আমরা তিনজন এমপি ছিলাম। বাকি দুজন বক্তৃতা দিল। আমাকে বক্তৃতাও দিতে দেয়নি। আর মানে এরশাদের একজন মন্ত্রী আমাদের ভোলারই, সে আমার বিরুদ্ধে খালি কথা বলত। তার একটা চিন্তা ছিল যে আমি আর্মি অফিসার। ফুটবল প্লেয়ার, গ্যালান্ট্রি অ্যাওয়ার্ড বীর বিক্রম। আমাকে না আবার মন্ত্রী–টন্ত্রী বানায়া দেয়। সে আমার বিরুদ্ধে বানিয়ে বানিয়ে অনেক কথা বলত। আর এরশাদ তো এগুলা বিশ্বাস করেন। আমাকে দেখলেই খুব রাগ রাগ হয়ে তাকাতেন। আমি দেখলাম যে এই লোক আর পছন্দ করে না। আর ওদিকে যাইও নাই। পরে এরশাদের পতনের পর আমি ইনডিপেনডেন্ট দাঁড়ালাম।

আমি আইডিওলজিক্যাল বাঙালি

হ্যাঁ, ’৯১ সালে আপনি ইনডিপেনডেন্ট দাঁড়ালেন। স্বতন্ত্র নির্বাচন করে জয়লাভ করলেন?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: ৩০০ আসনে মাত্র তিনজন (স্বতন্ত্র) জিতছে, তো আমি এদের মধ্যে হাইয়েস্ট ভোট পেয়েছিলাম। এই যে এরশাদের সময়টায় অনেক উন্নয়নকাজ করেছিলাম। এখানে আমাদের তো চরাঞ্চল মানে রাস্তাঘাট ছিল না, পুল–কালভার্ট ছিল না। তখন আর্মিও অনেক উন্নয়ন কাজ করতে পারত। এদের মাধ্যমে তারপর যারা মন্ত্রী ছিল, তাদের মাধ্যমে অনেক উন্নয়ন কাজ করেছি। যেমন প্রথম বছরেই আমি ৫৬টি ব্রিজ করেছিলাম। বড় বড় ব্রিজ। যার ফলে আগে আমার থানা সদরের দুই মাইলের বাইরে কোথাও যাওয়া যেত না। বাঁশের সাঁকো চতুর্দিকে। এগুলো সব ব্রিজ করে আর পাকা রাস্তা করে দিয়েছি। আমার যেই উপজেলা সদর, একটা গ্রামের মতো ছিল, বিদ্যুৎ ছিল না। ওখানে বিদ্যুৎ নিলাম, তারপর অনেক রাস্তা করলাম। পাঁচটা কলেজ করেছি আমার আব্বা–আম্মার নামে। আমার এই উপজেলায় এসব করে তাক লাগিয়ে দিয়েছি। লোকজন দেখছে যে এত উন্নয়নকাজ।

তারপরে আবার ’৯৬–এর নির্বাচন করলেন?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ:’৯১ সালে নির্বাচন করলাম। ’৯৬ সালে করলাম।

’৯৬–তে কি বিএনপিতে এসেছেন?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: ’৯২ সালে। ’৯১ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আসার পর বেগম জিয়া, যেহেতু আমি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে যুদ্ধ করেছি এবং তাঁর পিএস ছিলাম, তিনি আমাকে অনুরোধ করলেন।

তারপর তখনই কি মন্ত্রী হলেন?

হাফিজউদ্দিন আহমদ: না, ওইবার মন্ত্রী হইনি—মন্ত্রী হয়েছি ’৯৬ সালে। ’৯৬ সালে তো ওই ছোট একটা ঘটনা হয়েছিল—১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন। হ্যাঁ, ’৯৬–তে প্রথমে এমপি হলাম। আসলে ’৯৬–তে আমাদেরই ভুল ছিল। আমরা ১২০টি আসন পেয়েছিলাম, আর কয়েকটা পেলেই হতো। ব্যাপারটা হলো, ’৯১ সালে যাঁরা মন্ত্রী ছিলেন, তাঁরা সবাই হেরে গিয়েছিলেন; কিন্তু এমপিরা আবার জিতে এসেছিলেন। সেইভাবে ’৯৬–তে আমরা জিতলাম, কিন্তু আওয়ামী লীগ কয়েকটি আসন বেশি পাওয়ায় আমরা বিরোধী দলে পড়ে গেলাম। এরপর একনাগাড়ে সব কটি নির্বাচনই জিতেছি—শুধু এই হাসিনার সময়ের তিনটি ছাড়া আরকি।

এই তিনটাতে আপনি কি দাঁড়িয়েছিলেন?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: একটিতে দাঁড়িয়েছিলাম। বাকি দুইটিতে দাঁড়াইনি। ২০১৮ সালে আমাকে বাসায় পুলিশ ঘিরে রেখেছিল।

ওই তো রাতের ভোট হলো?

জুনিয়র চিকিৎসকদের বলি, ধৈর্য ধরো, হোমওয়ার্ক করো, ডাক্তারি ম্যাগাজিন পড়ো

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: হ্যাঁ, রাতের ভোট হলো এবং বাসা থেকেও বের হতে পারি নাই। ১৫ দিন গৃহবন্দী।

হ্যাঁ, আপনাকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছিল। তারপর এখন ২০২৬ সালে এসে আবার জয় লাভ করলেন। কত লাখ ভোটের ব্যবধান পেলেন?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: প্রায় এক লাখ ভোটের মতো ব্যবধান আমার সাথে।

ব্যবধানই এক লাখ?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: হ্যাঁ, ব্যবধানই এক লাখ। এ জন্য আমি আমার এলাকার জনগণকেই সবচেয়ে বেশি কৃতিত্ব দিই। কারণ, এবারের নির্বাচনের আগে টানা ১৬ বছর এলাকায় কোনো রাজনৈতিক কাজ করতে পারিনি। ২০১৮ সালে তো আমি গৃহবন্দীই ছিলাম। এর ফলে আমার সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের একটা জেনারেশন গ্যাপ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। তারপর আমি বিভিন্ন জায়গায় কয়েকটা জনসভা করেছি। সেখানে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেছি—পরিস্থিতি কী ছিল, আর এখন কী অবস্থা।

আমাদের দেশে নির্বাচন খুব টাফ হয়। ভালো একটি কর্মিবাহিনী দরকার। কিন্তু যে তরুণ প্রজন্ম আমার কর্মী ছিল, তাঁদের সঙ্গে তো ১৬ বছরে আমার যোগাযোগ প্রায় হারিয়েই ফেলেছিলাম।

এখন আমার বেশির ভাগ কর্মীই বয়স্ক হয়ে গেছে।

আপনার এলাকায় কতটা নির্বাচনী কেন্দ্র ছিল?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: ১১৯টি।

১১৯টি কেন্দ্রে মানে মিনিমাম তো প্রতিটি কেন্দ্রে ৫০ জন করে কর্মী লাগবে?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: হ্যাঁ। এই ১১৯টি কেন্দ্রের প্রতিটিতেই আমি প্রথম হয়েছি। আমার বিরুদ্ধে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা একটি কেন্দ্রেও জিততে পারেননি।

এত দিন তো আমরা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ইলেকশন করেছি। এবার যে প্রার্থী ছিলেন, তাঁকে আমি চিনিও না। তিনি জামায়াতের প্রার্থী, বয়সও কম। তাই আমাদের সঙ্গে আগে কোনো যোগাযোগ নাই। যা–ই হোক, জামায়াতের লোকজন এমনিতেই ভদ্র আচরণ করেছে। আমার বিরুদ্ধে তারা কোনো খারাপ কথা বলেনি, আমিও তাদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে কোনো খারাপ কথা বলিনি।

যা বলেছি, তাদের দলকে নিয়ে বলেছি, ’৭১ সালে স্বাধীনতাবিরোধী ছিল, এসব কথা বলেছি। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমি প্রার্থীকে আক্রমণ করিনি, প্রার্থীও আমার বিরুদ্ধে কোনো আক্রমণ করেননি। ইট ওয়াজ আ ভেরি ফেয়ার ইলেকশন। এটা ছিল আমার দশম ইলেকশন। অতীতের যেকোনো ইলেকশনের তুলনায় অনেক ফেয়ার ইলেকশন আমাদের অঞ্চলে।

জীবন থেকেই তো পালাবার চেষ্টা করেছি অনেকবার

১৯৭১ সালে আমরা তো বিজয়ী হয়েছি। একটি বিজয়ী জাতি হিসেবে আমাদের যে গৌরববোধ থাকার কথা, সেটা কি এখন কমে গেছে?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: হ্যাঁ, কমে গেছে। আওয়ামী লীগের অপকর্মের কারণেই এই গৌরববোধ অনেকটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এটাকে আবার রিস্টোর করতে হবে। এটা খুব বড় একটি বিষয়—জনগণের মনে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মানবোধ আবার জাগিয়ে তোলা। কারণ, যারা ১৯৭১ সালের ঘটনা দেখেনি, তারা কল্পনাও করতে পারবে না মুক্তিযোদ্ধারা কতটা সাহসী ছিলেন। আমাদের বহু সাফল্যের পেছনে মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত বিজয় একটি বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। সেই শক্তি ও চেতনাকে আবার ফিরিয়ে আনতে হবে। আর একটি বিষয় হলো—গণতান্ত্রিক, মুক্তমনা সমাজ গড়ে তোলা; যেখানে নারী-পুরুষের সমান অধিকার থাকবে। মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল সামাজিক সুবিচার, সাম্য ও মানবিক চেতনা প্রতিষ্ঠা করা। এসব মূল্যবোধকে আবার রিস্টোর করতে হবে। বৈষম্য কমাতে হবে—ধনী-গরিবের বৈষম্য, অঞ্চলভেদে বৈষম্য, নারী-পুরুষের বৈষম্য—সবই কমাতে হবে।

যে লক্ষ্য ধারণ করে যুদ্ধ হয়েছিল, মূলত সেটি ছিল গণতন্ত্রের জন্য যুদ্ধ। এটা ছিল একটি জনযুদ্ধ—সারা জাতি এতে অংশ নিয়েছিল। যারা ইয়াঙ্গার তারা অস্ত্র নিয়ে যারা একটু ওল্ডার তারা হয়তো অন্যভাবে সাহায্য করেছে। সেই চেতনা—বিশেষ করে গণতন্ত্রের চেতনা—রক্ষা করতে হবে। গণতন্ত্র না থাকলে যা হয়, সেটাই আমরা দেখেছি। ইলেকশনগুলো অবশ্যই ফেয়ার হতে হবে। হাসিনার সময় যদি তিনটি ইলেকশন ফেয়ার হতো, তাহলে তাঁকে এভাবে দেশ ছেড়ে পালাতে হতো না। একদমই না। তাই গণতন্ত্র যাতে টিকে থাকে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। গণতন্ত্র থাকলে দেশ ধীরে ধীরে উন্নতি করবেই। বাঙালি তো বীরের জাতি। আমরা এই যে সিলেটে যুদ্ধ করে সিলেট শহর দখল করলাম সিলেটের লোকজনই জানে না, আমার দলের লোকেরাও জানে না। আমি তাদের বললাম, এখানে আমরা যুদ্ধ করেছি। তাদের নিয়ে আমি এমসি কলেজে গেলাম। প্রিন্সিপালের বাসার ওপরের টিলায় উঠে বললাম—এই টিলার ওপর আমি ছিলাম, এখানে এই ঘটনা ঘটেছিল, ওদের মেশিনগান ছিল। তারা অবাক হয়ে আমার কাছ থেকে এসব কথা শুনল।

বাংলাদেশ নিয়ে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আপনি কি দেশের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল দেখেন, নাকি মনে করেন সামনে আরও অনেক সংগ্রাম বাকি?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: আমি বাংলাদেশের একটি চমৎকার ভবিষ্যৎ দেখি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মানুষের যে সাহস ও দেশপ্রেম দেখেছি, তা ছিল অতুলনীয়।

তারপর এত বছর পর আবার ২৪–এর জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে যেভাবে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে, সেটাও খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে সর্বস্তরের মানুষ অংশ নিয়েছে। শুধু ছাত্রছাত্রী নয়—আমি তো দেখেছি ছাত্রদের অভিভাবকেরাও রাস্তায় নেমে এসেছেন। নারী-পুরুষনির্বিশেষে সাধারণ পেশার মানুষ, এমনকি দরিদ্র ও খেটে খাওয়া মানুষও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রামে নেমে এসেছে। এটা দেখে আমার মনে হয়, বাংলাদেশের সামনে একটি চমৎকার ভবিষ্যৎ রয়েছে।

আমার নিজের থানায় ১২ জন শহীদ হয়েছেন। তাদের মধ্যে একজনও ছাত্র না। কেউ মুদিদোকানদার, কেউ ঠেলাগাড়িচালক, কেউ রিকশাচালক—অর্থাৎ একেবারে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। ওই থানারই ১২ জন ঢাকায় গিয়ে শহীদ হয়েছেন। তাঁরা কেউ ছাত্র ছিলেন না; তাঁরা ছিলেন দরিদ্র, পরিশ্রমী মানুষ। তারা তো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যই জীবন দিয়েছেন। সুতরাং আমি মনে করি, এই দেশের ভবিষ্যৎ অবশ্যই আছে।

শেখ হাসিনার মতো একজন স্বৈরশাসককে যেভাবে জনগণ সরিয়ে দিয়েছে। হেলিকপ্টার থেকে গুলি করা হচ্ছে তারপর আয়নাঘরে এত নির্যাতন এসব দেখে মানুষ সরকারবিরোধী মনোভাব ধরে রেখেছে। এসব ঘটনা দেখে আমার মনে হয়, বাংলাদেশের সামনে ভালো একটি ভবিষ্যৎ রয়েছে। উই নিড আ গুড লিডারশিপ। নেতৃত্ব ভালো হলে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে এটাই আমার ধারণা।

আর একটা প্রশ্ন—সামান্য না, বরং বড় প্রশ্ন। হঠাৎ করে আবার ইরানে হামলা হলো; আমেরিকা ও ইসরায়েল মিলে আক্রমণ করেছে। এতে তেলের দামও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আমি অন্তত একটু শঙ্কিত।

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: অবশ্যই শঙ্কার কারণ আছে। ’৭৩ সালে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার ফলে যেমন সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এসেছিল, তেমন পরিস্থিতি আবারও তৈরি হতে পারে। এবারের সংঘাতে ইরান চেষ্টা করছে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে, কিন্তু এত বড় পরাশক্তির বিরুদ্ধে একা লড়াই করে টিকে থাকা খুব কঠিন। অনেকের মতে, এসব ক্ষেত্রে আমেরিকা প্রায়ই নিজের স্বার্থের দিকটাই আগে দেখে—বিশেষ করে জ্বালানি ও ভূরাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্নে। ইরাক ও লিবিয়ার ঘটনাও আমরা দেখেছি—সেসব যুদ্ধের পর ওই দেশগুলো মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে যে উত্তেজনা চলছে, সেটিও এই সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলছে। এই যুদ্ধ যদি তিন মাস বা তারও বেশি সময় ধরে চলে, তাহলে বাংলাদেশের মতো ছোট অর্থনীতির দেশগুলোর ওপর তার প্রভাব পড়বে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন, বিদ্যুৎ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামও বাড়তে পারে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে কষ্ট বাড়বে। তাই আমরা আশা করব, বড় শক্তিগুলোর মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে কোনো মধ্যস্থতা তৈরি হবে এবং যুদ্ধ দ্রুত বন্ধ হবে। তা না হলে এটি আমাদের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। উই হ্যাভ টু টাইটেন আওয়ার বেল্ট। আমাদের দেশে আবার লোডশেডিং বা জ্বালানি সংকটের মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। অনেক সময় অন্য দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা সংঘাতের প্রভাব আমাদের মতো দেশগুলোকেও ভোগ করতে হয়। বিনা দোষে অন্যদের ট্রাম্পের এই যে আগ্রাসী মনোভাব অন্যদের পাপের শাস্তি আমরা ভোগ করব। … স্বাবলম্বী না হতে পারলে বা নিজস্ব ইকোনমি একটা দাঁড় করতে না পারলে পরাশক্তির ক্রীড়নক হিসেবে থাকতে হবে। আশা করি, বাংলাদেশ আগামী দিনে নিশ্চয়ই অর্থনৈতিক অবস্থা আরও ভালো হবে এবং আমরা একটা ব্যালান্সড পররাষ্ট্রনীতি এখন দরকার; আমরা কারও পকেটেও যাব না, কারও সঙ্গে যুদ্ধ তো আমরা চাই না। সবার সাথে মিত্রতা চাই এবং বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’— আমাদের দলের যেটা স্লোগান, এখন এইভাবে আমরা টিকে থাকতে হবে কষ্ট করে হলেও।

আপনি অনেক সময় দিলেন ধন্যবাদ।

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: ঠিক আছে। আরও বলে রাখি আমি আপনার একজন ভক্ত, পাঠক। আপনার ‘মা’ উপন্যাস পড়ে খুবই আনন্দিত হয়েছি। আপনার লেখা আরও দীর্ঘজীবী হোক—এটাই কামনা করি।

আপনার বইটিও খুব সুন্দর, সত্যিই খুব সুলিখিত একটি বই।

সুধীমণ্ডলী, আমরা এতক্ষণ বীর মুক্তিযোদ্ধা হাফিজউদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম—তাঁর জীবনের গল্প শুনলাম। ফুটবলার ও দৌড়বিদ হিসেবে তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতার শুনলাম, পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিও শুনলাম। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের যে চেতনা দিয়েছে এবং পরবর্তীতে ২৪–এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মানুষের প্রতিরোধের শক্তি, টিকে থাকার শক্তি এবং গণতন্ত্রপ্রেম আবারও প্রকাশ পেয়েছে।

এই চেতনার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে—এই আশাবাদ আমরা নতুন করে আমাদের হৃদয়ে ধারণ করব এবং সেই বিশ্বাস নিয়ে সামনে এগিয়ে যাব। সবাই ভালো থাকবেন।

Read at source