আপনার পেটে কি চর্বি নাকি ইনফ্ল্যামেশন? কীভাবে বুঝবেন আর কী করবেন

· Prothom Alo

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের পেটের দিকে তাকিয়ে অনেকেই ভাবেন এটা কি শুধু বেশি খাওয়ার ফল? এ কী মেদ নাকি ইনফ্ল্যামেশন? আধুনিক গবেষণা বলছে, বেড়ে যাওয়া পেট শরীরের ভেতরে চলতে থাকা নানা জটিল প্রক্রিয়ার একটি দৃশ্যমান প্রকাশ।

Visit newssport.cv for more information.

সারা শরীর ফিট থাকলেও পেট যেন কমে না। এই সমস্যা আমাদের অনেকেরই আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পেট বাড়ার বিষয়টা বোঝার জন্য প্রথমেই জানতে হবে, সব মেদ একরকম নয়। মেদের ধরন আর সেটা কোথায় জমছে, সেটাই আসল। পেটের মেদ সাধারণত দুই ধরনের। প্রথমটি সাবকিউটেনিয়াস ফ্যাট, যা ত্বকের ঠিক নিচে জমা হয় এবং হাত দিয়ে চিমটি কেটে ধরা যায়। এটি তুলনামূলক কম ক্ষতিকর। দ্বিতীয়টি ভিসেরাল ফ্যাট, যা পেটের গভীরে লিভার, অন্ত্রসহ বিভিন্ন অঙ্গের চারপাশে জমে। এই ফ্যাট বাইরে থেকে খুব একটা বোঝা না গেলেও এটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে, ভিসেরাল ফ্যাট ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ এমনকি কিছু ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়ায়।

ইনফ্ল্যামেশনের লক্ষণ হিসেবে পেট ফাঁপা, হজমে সমস্যা দেখা দিতে পারে

অনেক ক্ষেত্রে পেট বাড়া শুধু মেদ নয়, বরং শরীরের ক্রনিক ইনফ্ল্যামেশনের ফল। যখন শরীরে দীর্ঘদিন ধরে হালকা প্রদাহ (low-grade inflammation) থাকে, তখন কর্টিসলসহ কিছু হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। এর ফলে শরীর বিশেষ করে পেটের অংশে চর্বি জমাতে শুরু করে। এ ধরনের ইনফ্ল্যামেশনের লক্ষণ হিসেবে পেট ফাঁপা, হজমে সমস্যা, ক্লান্তি এসবও দেখা দিতে পারে। ফলে অনেক সময় মানুষ মনে করেন তিনি মোটা হয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু বাস্তবে এটি শরীরের ভেতরের ভারসাম্যহীনতার প্রতিফলন।

ভুঁড়ির পেছনে অন্য কারণগুলো

পেট বাড়ার পেছনে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। হরমোনাল সমস্যার মধ্যে থাইরয়েডের সমস্যা বা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স উল্লেখযোগ্য। এগুলো শরীরের মেটাবলিজম কমিয়ে দেয়, ফলে সহজেই চর্বি জমে।

পেট বাড়ার পেছনে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে

এছাড়া গাট হেলথ বা অন্ত্রের স্বাস্থ্যের অবনতি হলে পেট ফাঁপা, গ্যাস বা আইবিএসের মতো সমস্যা দেখা দেয়, যা অনেক সময় ভুঁড়ির মতোই মনে হয়। অন্যদিকে, দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ ও ঘুমের অভাব শরীরে কর্টিসল বাড়িয়ে দেয়, যা সরাসরি পেটে মেদ জমার সঙ্গে সম্পর্কিত। পাশাপাশি অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, চিনি ও ট্রান্স ফ্যাটও এই সমস্যাকে ত্বরান্বিত করে।

কীভাবে বুঝবেন আপনার ভুঁড়ির কারণ?

বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু সহজ লক্ষণ দেখে ধারণা পাওয়া যায়। যদি পেটের মেদ নরম হয় এবং চিমটি কেটে ধরা যায়, তাহলে এটি সাবকিউটেনিয়াস ফ্যাট হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

যদি পেট শক্ত লাগে এবং সব সময় ফুলে থাকে, তাহলে তা ভিসেরাল ফ্যাট বা ইনফ্ল্যামেশনের ইঙ্গিত হতে পারে

কিন্তু যদি পেট শক্ত লাগে এবং সব সময় ফুলে থাকে, তাহলে তা ভিসেরাল ফ্যাট বা ইনফ্ল্যামেশনের ইঙ্গিত হতে পারে। খাবারের পর পেট অতিরিক্ত ফুলে গেলে গাট সমস্যার সম্ভাবনা থাকে। আবার যারা দীর্ঘদিন স্ট্রেসে থাকেন বা ঘুম কম হয়, তাদের ক্ষেত্রে কর্টিসলজনিত মেদ জমার প্রবণতা বেশি দেখা যায়।

পেটের মেদ কমাতে শুধু খাবার কমানো যথেষ্ট নয় বরং জীবনযাত্রার সামগ্রিক পরিবর্তন জরুরি।

প্রথমত, খাদ্যতালিকায় অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি খাবার যোগ করা দরকার। সবুজ শাকসবজি, ফল, ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ মাছ ও বাদাম, পাশাপাশি হলুদ ও আদা শরীরের প্রদাহ কমাতে সহায়ক।

খাদ্যতালিকায় অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি খাবার যোগ করা দরকার

দ্বিতীয়ত, প্রসেসড ফুড, অতিরিক্ত চিনি ও সফট ড্রিংক যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে।

তৃতীয়ত, নিয়মিত ব্যায়াম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ওয়েট ট্রেনিং ও কার্ডিও একসঙ্গে করলে মেদ কমাতে বেশি কার্যকর হয়।

নিয়মিত ব্যায়াম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ওয়েট ট্রেনিং ও কার্ডিও

চতুর্থত, পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা জরুরি। প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম না হলে শরীরের হরমোনাল ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়।

সবশেষে, মানসিক চাপ কমানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মেডিটেশন, প্রার্থনা বা নিজের পছন্দের কাজের মাধ্যমে স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণে রাখা যেতে পারে।

কখন সতর্ক হবেন?

যদি হঠাৎ করে পেট ফুলে যায়, ওজন না বাড়লেও ভুঁড়ি বাড়তে থাকে, সব সময় ক্লান্তি লাগে বা হজমে সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী থাইরয়েড, ব্লাড সুগার বা লিভার ফাংশন টেস্ট করানো যেতে পারে।

যদি হঠাৎ করে পেট ফুলে যায়, ওজন না বাড়লেও ভুঁড়ি বাড়তে থাকে, সব সময় ক্লান্তি লাগে তবে চিকিৎসা নিন

পেট বেড়ে যাওয়াকে শুধুমাত্র বাহ্যিক সৌন্দর্যের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ আর নেই। এটি শরীরের ভেতরের জটিল সংকেত বহন করে। তাই সচেতনতা, সঠিক জীবনযাপন এবং প্রয়োজনে চিকিৎসা এই তিনের সমন্বয়েই সম্ভব পেটের শেপ নিয়ন্ত্রণে আনা এবং সুস্থ থাকা।

ছবি: এআই

Read at source