মুক্তিযুদ্ধের শক্তি ও চৈতন্য উদ্বোধনের তাগিদ

· Prothom Alo

পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পেছনে ছিল পূর্ব বাংলার মানুষের বিশেষ অবদান। অথচ প্রথম থেকেই এই বাংলার মানুষদের অবজ্ঞা, সন্দেহ, অপমান, শোষণ ও বঞ্চনার নানা তৎপরতায় সক্রিয় ছিল পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী। অর্থনৈতিক বৈষম্য তো ছিলই, তার সঙ্গে ছিল সামরিক স্বৈরশাসনের অবিরাম জুলুম, ছিল বাঙালি বিদ্বেষের অপমান, বাঙালি মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে সন্দেহ ও কুৎসা; সেই সঙ্গে প্রশাসন, ব্যবসা–বাণিজ্য, সামরিক–বেসামরিক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোয় বাঙালিদের প্রান্তিক করে রাখা। এমনকি ‘হিন্দুয়ানি’ তকমা এঁটে এবং প্রচার দিয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য থেকে বাঙালিদের বিচ্ছিন্ন করার নানা অপচেষ্টাও করা হয়েছে। 

সমাজবিজ্ঞানী হামজা আলাভি সঠিকভাবেই পাকিস্তান রাষ্ট্রকে অতিবিকশিত সামরিক আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। সামরিক–বেসামরিক আমলাতন্ত্রের এই ভারী বোঝার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ–পরবর্তী বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী মানচিত্র গোছানোতে পাকিস্তানের ওপর ভর করা। এর জন্য পাকিস্তানকে যথাক্রমে ১৯৫৪ ও ১৯৫৫ সালে সিয়াটো ও সেন্টো সামরিক চুক্তিতে যুক্ত করা হয়। এ ছাড়া তৎকালীন মার্কিন অনুগত রাষ্ট্র তুরস্ক, ইরানসহ পাকিস্তান নিয়ে গঠন করা হয় আরডিসি বা আঞ্চলিক উন্নয়ন সংস্থা। পাকিস্তান হয়ে দাঁড়ায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের খুঁটি। পাশাপাশি বৈষম্য বৃদ্ধির কারণে গড়ে ওঠে অতিধনী ২২ পরিবার।

Visit extonnews.click for more information.

এ অবস্থার বিরুদ্ধে জনপ্রতিরোধ হয়েছে, পাকিস্তানের দুই প্রান্তেই গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিস্তার ঘটেছে। আর তারই চাপে ১৯৬৯ সালে এক সামরিক জেনারেলের পতন হয়, আরেক সামরিক জেনারেল নির্বাচন দিতে বাধ্য হন। প্রতিষ্ঠার ২৩ বছর পর ১৯৭০ সালে প্রথম পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং প্রথম সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত জাতীয় গণপরিষদের মাধ্যমে সংবিধান প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় তাদের অস্থির করে তোলে। ২২ পরিবার, সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র এবং যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী কোনো ধরনের পরিবর্তন মেনে নিতে সম্মত ছিল না।

১৯৭১ সালের ৩ মার্চ নির্বাচিত জাতীয় পরিষদের প্রথম অধিবেশন বসার কথা ছিল। দুদিন আগে ১ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সেই অধিবেশন স্থগিত করায় স্পষ্ট হয় যে পাকিস্তান রাষ্ট্রের মধ্যে কোনো গণতান্ত্রিক পরিবর্তনই সম্ভব নয়। পাকিস্তানের মৃত্যুঘণ্টা বাজতে থাকে। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান তখন একক নেতা হিসেবে আবির্ভূত। নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রধান হিসেবে এটা তাঁর সাংবিধানিক এখতিয়ারও। সে সময় অন্যান্য নেতা ও দলও শেখ মুজিবের সমর্থনে দাঁড়ালেন। মাওলানা ভাসানী, মণি সিংহ, সিরাজ সিকদার তাঁদের অন্যতম। সিরাজ সিকদার সে সময় স্বাধীনতাসংগ্রাম পরিচালনার জন্য শেখ মুজিবকে সর্বদলীয় কমিটি গঠনের আহ্বান জানান। শেখ মুজিব শেষ পর্যন্ত আলোচনার পথ খোলা রেখেছিলেন, কিন্তু সামরিক জান্তা নৃশংসতম গণহত্যা শুরুর মাধ্যমে কার্যত পাকিস্তানের সমাপ্তি ঘোষণা করে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত থেকে এই দানবীয় অপশক্তির ভয়ংকর থাবা নিশ্চিত করে যে পাকিস্তান থেকে মুক্তির জন্য যুদ্ধ ছাড়া আর কোনো পথ নেই।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দুটি বয়ান সমস্যাজনক। প্রথমটি হলো মুক্তিযুদ্ধ মানে আওয়ামী লীগ; মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ মানেই আওয়ামী লীগ সমর্থন—তাদের সব অপকর্মের বৈধতা দিতে মুক্তিযুদ্ধকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা। দ্বিতীয়টি হলো, মুক্তিযুদ্ধ একটি চক্রান্ত, ভারতের স্বার্থসিদ্ধির জন্যই বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা—এ রকমের অপপ্রচার। এই দুটি বয়ানই জনগণের বিপুল সাহস ও অসম্ভব লড়াইকে অগ্রাহ্য করে।

এটা ঠিক যে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভারতের নানা রকম হিসাব-নিকাশ ছিল, তাদের ভূরাজনৈতিক নানা বিবেচনা ছিল। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের ভেতরেও নানা সমস্যা ও অন্তর্দ্বন্দ্ব ছিল। কিন্তু এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও একটা বর্বর দখলদার সেনাবাহিনীর আক্রমণ মোকাবিলা করতে গিয়ে বাংলাদেশের জনগণ যে শক্তি, সাহস, ঐক্য দেখিয়েছে; যে বিশাল প্রত্যাশা ও স্বপ্ন নিয়ে অসংখ্য মানুষ জীবনকে তুচ্ছ করেছে তার বিশালত্বকে ছোট করার চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

তবে বিভিন্ন কারণে স্বাধীনতার পর জনপ্রত্যাশার ভাঙন ঘটেছে দ্রুত। তৎকালীন ঘটনাপ্রবাহের প্রধান দুই ব্যক্তি শেখ মুজিব ও তাজউদ্দীন আহমদের মধ্যেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বব্যাংকের ওপর নির্ভরশীলতা এবং বাকশাল গঠন নিয়ে গুরুতর মতপার্থক্য দেখা দেয়। সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য ছাড়াও সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতির ভয়াবহ অবস্থা এবং পরে একদলীয় ব্যবস্থা বাকশাল প্রতিষ্ঠায় তাজউদ্দীন মোটেই সন্তুষ্ট ছিলেন না। এরই মধ্যে এক দিন তর্কবিতর্ক করতে করতে শেখ মুজিবকে তিনি সরাসরি বলেছিলেন, ‘মুজিব ভাই, এই জন্যই কি আমরা ২৪ বছর সংগ্রাম করেছিলাম? যেভাবে দেশ চলছে, আপনিও থাকবেন না, আমরাও থাকব না, দেশ চলে যাবে রাজাকার–আলবদরদের হাতে।’ (তাজউদ্দীন আহমদ: নেতা ও পিতা, শারমিন আহমদ)

এরপর পাঁচ দশক পার হয়েছে। এ সময়ে দুজন রাষ্ট্রপতি খুন হয়েছেন, দুই দফা প্রত্যক্ষভাবে সামরিক শাসন এসেছে, সংবিধান সংশোধন হয়েছে ১৬ বার, শাসনব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে কর্তৃত্ববাদী হয়েছে, ১৯৯০ ও ২০২৪ গণ–অভ্যুত্থানে দুই স্বৈরশাসকের পতন হয়েছে। ২০২৬ সালের শুরুতে নতুন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় বসেছে। পাশাপাশি এই কয়েক দশকে অর্থনীতির আয়তন ক্রমে বেড়েছে, জিডিপি ও বিশ্ববাণিজ্যে উল্লম্ফন ঘটেছে, অবকাঠামো ছাড়াও সমাজে আয় ও পেশার ধরনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন এসেছে। সম্পদের কেন্দ্রীভবন ও বৈষম্যও বেড়েছে, পাকিস্তানের ২২ পরিবারের মতো কতিপয় গোষ্ঠীর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কর্তৃত্বে আটকে গেছে দেশ।

ফ্রান্‌ৎস ফানোঁর কথা স্মরণ করে বলতে পারি, স্বাধীনতার জন্য দখলদার বা ঔপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জাতীয় চেতনা খুবই দরকার। কিন্তু তা যদি সামাজিক ক্ষমতাবিন্যাসের পরিবর্তনে প্রয়োজনীয় চৈতন্যে উন্নীত না হয়, তবে তা অন্তঃসারশূন্য হয়ে যায়। বাংলাদেশে তাই দেখি জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই থেকে প্রাপ্ত দেশে বাঙালি শাসকেরা অন্য জাতির ওপর নিপীড়নের ব্যবস্থা অব্যাহত রেখেছে। ২২ পরিবারের মতো সম্পদ কেন্দ্রীভবনের বিরুদ্ধে লড়াই হলেও আরও বড় লুটেরা গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদ ও সামরিকীকরণের বিরুদ্ধে লড়াই হলেও তা নতুন করে ভিত গেড়েছে। একের পর এক জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি হয়েছে। ২০২৪–এর গণ–অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এক স্বৈরশাসনের পতন হলেও সামাজিক–রাজনৈতিক শক্তিবিন্যাসের বলে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় সাম্রাজ্যবাদ–অনুগত গোষ্ঠী ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীসহ উগ্র দক্ষিপন্থীদের অধিকতর দাপট তৈরি হয়েছে। এ সময় বাংলাদেশকে হাত–পা বেঁধে যুক্তরাষ্ট্রসহ নানা বিপজ্জনক চুক্তিতে জড়ানো হয়েছে। 

একাত্তরে আমরা দেখেছি জনযুদ্ধ; বাংলাদেশের মানুষের এক মহান অভ্যুদয়; কতিপয় আলবদর–রাজাকার বাদে বাকি সব মানুষের সম্মিলিত অসামান্য প্রতিরোধ ও সৃষ্টির পর্ব—যা এখনো আমাদের সামনের মুক্তির লড়াইকে সাহস জোগায়। সে জন্য অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধের শক্তি ও চৈতন্যের বিকাশের ধারায় দেশের নীতিকাঠামো ও সম্পদের ওপর জনগণের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, সাম্রাজ্যবাদসহ বিদেশি আধিপত্য, শ্রেণিগত-লিঙ্গীয়-জাতিগত-ধর্মীয় বৈষম্য ও নিপীড়নবিরোধী লড়াইয়ের শক্তি সমাবেশ জোরদার করার গুরুত্ব এখন অনেক বেশি।

Read at source