চীন–ভারতের এই স্নায়ুযুদ্ধের বলি যারা
· Prothom Alo

এক দশকের বেশি সময় ধরে ভারত ও চীনের মধ্যে দ্বন্দ্বের এক নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে ইয়ারলুং সাংপো বা ব্রহ্মপুত্র নদ। উজান দেশ হিসেবে চীন এই নদের ওপর একের পর এক বিশাল জলবিদ্যুৎকেন্দ্র বা বাঁধ নির্মাণ করছে। বিশেষ করে ৬০ গিগাবাইট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে প্রস্তাবিত ‘গ্রেট বেন্ড’ প্রকল্পটিকে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
Visit freshyourfeel.org for more information.
এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় ভারতের পানি কূটনীতি যতটা সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন ছিল, বাস্তবে তা দেখা যাচ্ছে না। বেইজিংকে একটি স্থায়ী পানিবণ্টন চুক্তিতে বাধ্য করার পরিবর্তে নয়াদিল্লি এখন ‘বাঁধের জবাবে বাঁধ’ নীতি গ্রহণ করেছে। এই অবস্থান ওই অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য চরম ঝুঁকি তৈরি করছে।
ব্রহ্মপুত্র নদ নিয়ে চীন ও ভারত দুই দেশই প্রতিযোগিতামূলক ও অচল এক সম্পর্কের জালে আটকে আছে। উভয় দেশই এই অভিন্ন নদকে নিজের সীমানায় পূর্ণ ব্যবহারের বিশেষ অধিকার ভোগ করতে চায়। ইয়ারলুং সাংপো অববাহিকায় চীনের হাইড্রোলিক প্রকল্পের আওতা বিশাল। সাংমু ও জিয়াচা বাঁধের পাশাপাশি আরও অন্তত ১৮টি বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করছে তারা। চীন মূলত এই নদ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিশ্বের দরবারে নিজের আধিপত্য ও শক্তিমত্তা জাহির করতে চায়।
চীন ও ভারতের মধ্যকার এই পানি–রাজনীতি নিয়ে ভারতের অভ্যন্তরেও মতভেদ আছে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মা মনে করেন যে চীনের এসব প্রকল্পের ফলে ভাটির খুব একটা ক্ষতি হবে না। অথচ অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু চীনা বাঁধগুলোকে ‘চলমান বোমা’ ও জীবনঘাতী হিসেবে অভিহিত করেছেন।
চীন ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘের ‘ওয়াটারকোর্স কনভেনশন’-এ সই করেনি। ফলে তারা পানি ব্যবহারের তথ্যের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গোপনীয়তা বজায় রাখে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চীন তথ্যকে একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০২২ সালের পর থেকে চীন ভারতের সঙ্গে আর কোনো নিয়মিত পানি-সংক্রান্ত তথ্য বিনিময় করেনি।
তথ্যের এই অপ্রতুলতা বা গোপনীয়তা ভাটির দেশগুলোর জন্য একধরনের ‘মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’। ২০২০ সালের সীমান্ত উত্তেজনার পর চীন পানি–সম্পর্কিত উপাত্ত না দেওয়ায় বন্যার পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষেত্রে বিপাকে পড়েছে ভারত।
চীনের এই আগ্রাসনের জবাবে ভারত কী করছে? প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর পূর্বসূরিদের তুলনায় আন্তর্জাতিক স্তরে এ বিষয়ে বেশি সোচ্চার হলেও এখনো চীনের সঙ্গে কার্যকর কোনো স্থায়ী পানিবণ্টনের ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। ২০১৫ সালের চীন সফরে এবং পরবর্তী সময়ে জি-২০ সম্মেলনেও তিনি এই সংকট তুলে ধরেছিলেন। তবে এর ফল এখন পর্যন্ত শূন্য।
চীনে উত্তাল হচ্ছে ভারতবিরোধিতার ঢেউমূলত মোদি সরকার ২০০২ ও ২০০৮ সালে স্বাক্ষরিত তথ্য বিনিময়ের প্রাথমিক চুক্তির গণ্ডি থেকে এখনো বেরিয়ে আসতে পারেনি। পানি বিনিময়ের সেই পুরোনো সমঝোতা স্মারকটি ২০২৫ সালের জুনে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে এবং সেটি নতুন করে এখনো সই হয়নি। গত দুই দশকে কোনো শক্ত কূটনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে নয়াদিল্লি।
ভারতের এই নীরবতার পেছনে রয়েছে তাদের এক গোপন আকাঙ্ক্ষা। চীনকে ঠেকানোর প্রধান হাতিয়ার হিসেবে নয়াদিল্লি বেছে নিয়েছে বিশাল সব জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করা। এর মধ্যে টুয়েন্টি হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রকল্প অন্যতম।
কৌশলগত অবস্থানের কারণে অরুণাচল প্রদেশে এসব বাঁধ তৈরির লক্ষ্য হলো, ‘আগে থেকে ব্যবহারের অধিকার’ নিশ্চিত করা। সহজ কথায়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দাবি করা যে ভারতই আগে এই পানি ব্যবহার শুরু করেছে, তাই পানির স্বাভাবিক প্রবাহ পাওয়ার অধিকার তাদেরই বেশি।
ভারত সরকার দাবি করছে যে এসব বড় প্রকল্প পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করবে এবং চীন থেকে হঠাৎ ছেড়ে দেওয়া পানিতে সৃষ্ট বন্যা রুখবে। পাশাপাশি এই বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো রাজ্যগুলোর কোষাগার ভরবে এবং পরিবেশ রক্ষা করবে। তবে বাস্তব চিত্র বেশ উদ্বেগের। অরুণাচলের আদিবাসীরা এসব প্রকল্পে ব্যাপক উষ্মা প্রকাশ করছেন।
কারণ, সেখানে তাঁদের কোনো সম্মতি নেওয়া হচ্ছে না। উল্টো যাঁরা প্রতিবাদ করছেন, তাঁদের ‘উন্নয়নবিরোধী’ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ভারতের নীতিনির্ধারকেরা বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে বাঁধের প্রতিবাদ করলে মূলত চীনের স্বার্থরক্ষা হবে। এই ভয়ের রাজনীতি নদের পারের মানুষের কণ্ঠস্বরকে দাবিয়ে রাখছে।
চীন ও ভারতের মধ্যকার এই পানি–রাজনীতি নিয়ে ভারতের অভ্যন্তরেও মতভেদ আছে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মা মনে করেন যে চীনের এসব প্রকল্পের ফলে ভাটির খুব একটা ক্ষতি হবে না। অথচ অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু চীনা বাঁধগুলোকে ‘চলমান বোমা’ ও জীবনঘাতী হিসেবে অভিহিত করেছেন।
নিজেদের স্বার্থ ও রাজনীতির তাগিদে নেতাদের এমন দ্বিধাবিভক্ত মন্তব্য স্থানীয় মানুষের মধ্যে বিভক্তি ও আস্থাহীনতা বাড়াচ্ছে। মূলত তথ্যের সঠিক অভাব আর অস্পষ্টতাকে কাজে লাগিয়ে সরকার তার বৃহৎ বাঁধ প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
পারমাণবিক শক্তিধর দুটি দেশ যেখানে সরাসরি সীমান্ত নিয়ে যুদ্ধংদেহী অবস্থানে থাকে সেখানে নদীর সংকট পুরো হিমালয় অঞ্চলের পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। বর্তমান অচলাবস্থা কাটানোর জন্য শুধু সাধারণ সমঝোতা স্মারক বা বিশেষজ্ঞ বৈঠক দিয়ে কাজ হবে না।
এখন প্রয়োজন আদিবাসীদের অধিকার ও পরিবেশ রক্ষার কথা বিবেচনা করে একটি সুনির্দিষ্ট ও বাধ্যতামূলক বহুপক্ষীয় চুক্তি। ভারতের আত্মতৃপ্তিতে না ভুগে কূটনীতির মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানে মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় ব্রহ্মপুত্র তার দুই পাশের কোটি মানুষের কাছে শুধু নদ নয়; বরং এক চরম অভিশাপের নাম হয়ে দাঁড়াবে।
ভাস্কর জ্যোতি ডেকা গুয়াহাটির কটন ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।
দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত