চট্টগ্রাম থেকে ওমান, আমার সেই সব ঈদের স্মৃতি: মেহজাবীন চৌধুরী

· Prothom Alo

আমার জন্ম চট্টগ্রামে। খুব ছোটবেলায়, প্রায় দুই বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে দেশ ছেড়েছিলাম। ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত দেশটিতেই ছিলাম। শৈশব–কৈশোরের বেশির ভাগ সময় কেটেছে ওমানে। ছোটবেলার ঈদের সঙ্গে দেশটির সোহর ও মাসকাট শহরের স্মৃতি জড়িয়ে আছে।

তখন আমি ইন্ডিয়ান স্কুল সোহরে ও পরে ইন্ডিয়ান স্কুল মাসকাটে পড়তাম। সেই সময়ের ঈদের আনন্দের রেশ আজও রয়ে গেছে। ঈদের জামা লুকিয়ে রাখতাম। বন্ধুরা যেন জামাটি দেখে না ফেলে। ভাবতাম, আমার জামাটিই সবচেয়ে সুন্দর। শৈশবের সরল আনন্দগুলো কতটা মূল্যবান ছিল, এখন তা বুঝতে পারি।

Visit amunra-opinie.pl for more information.

প্রথম রোজা থেকেই ওমানে ঈদের আমেজ শুরু হয়। কেনাকাটা, খাওয়াদাওয়া—সবকিছুতেই উৎসবের আবহ ছিল। অনেক রেস্টুরেন্টে দেখেছি, যাঁরা রোজা রেখেছেন, তাঁদের বিনা মূল্যে ইফতার করানো হচ্ছে। শুধু রেস্টুরেন্ট নয়, অনেক মসজিদেও এমন ব্যবস্থা থাকত, যেখানে যে কেউ গিয়ে নির্বিঘ্নে ইফতার করতে পারতেন।

সবাইকে একসঙ্গে বসিয়ে খাওয়ানোর এই সংস্কৃতি আমার কাছে এখনো অত্যন্ত সম্মানের। সেখানে সমতার চর্চা খুব স্পষ্ট ছিল। বিদেশি হয়েও কখনো নিজেকে আলাদা মনে হয়নি। সবাইকে সমান সম্মান ও আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করা হতো।

শৈশবে পরিবারের সঙ্গে মেহজাবীন চৌধুরী। (বাঁ থেকে) মেহজাবীন চৌধুরী, মা গাজালা চৌধুরী, ভাই মাসদাক চৌধুরী, বাবা মহিউদ্দিন চৌধুরী ও বাবার কোলে বোন কায়নাত করিম চৌধুরী। ছবি: শিল্পীর পারিবারিক অ্যালবাম থেকে

ওমানে চাঁদরাত ছিল ঈদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় মুহূর্ত। আম্মুর সঙ্গে বসে হাতে মেহেদি লাগানো, শুকানোর জন্য অপেক্ষা করা, আর বারবার দেখে আনন্দ পাওয়া ছিল আনন্দের এক অনুভূতি। রাতে ঘুম খুব একটা আসত না, টেলিভিশনে চাঁদরাতের অনুষ্ঠান দেখতাম, চারপাশে উৎসবের আবহ থাকত। ঈদের সকালটাও ছিল অন্য রকম। খুব ভোরে উঠে পড়তাম। আম্মু আগেই নানা রকম মিষ্টান্ন ও সেমাই প্রস্তুত করে রাখতেন। পরিবারের সবাই মিলে নতুন পোশাক পরে ছবি তুলতাম।

দুপুরের দিকে আম্মু কী রান্না করছেন, তা দেখতে রান্নাঘরে বারবার উঁকি মারতাম। আব্বুর অতিথি এলে টেবিল সাজাতে সাহায্য করতাম। ছোট ছোট এসব কাজের মধ্যেই ঈদের নির্ভেজাল আনন্দ খুঁজে পেতাম। তখন ঈদ মানেই ছিল দুশ্চিন্তামুক্ত এক নির্মল আনন্দের সময়।

স্কুলে বন্ধুদের সঙ্গে এই সময়টা বিশেষভাবে উপভোগ করতাম। শপিং করতে গিয়ে তাদের সঙ্গে দেখা হওয়া, কে কী নিচ্ছে, তা নিয়ে মজা করা, ঈদের দিন একসঙ্গে ঘুরতে যাওয়া কিংবা সমুদ্রসৈকতে খেলাধুলা করা আমার স্মৃতিতে আজও উজ্জ্বল। যত বড় হয়েছি, ততই উপলব্ধি করেছি তাঁরা কীভাবে রমজানকে সবার জন্য আনন্দের সময়ে পরিণত করতেন। এই ভালোবাসা ভাগ করে নেওয়ার সংস্কৃতি আজও আমার কাছে অত্যন্ত মূল্যবান।

মেহজাবীন চৌধুরী

পরিবারই জীবনের কেন্দ্র

আমার কাছে মা, বাবা, ভাই, বোন এবং পুরো পরিবারই জীবনের কেন্দ্র। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো ঈদের সবচেয়ে প্রিয় মুহূর্ত। বিশেষ করে ঈদের আগে সবাই মিলে কেনাকাটায় বের হওয়ার আনন্দটি আলাদা। সারা বছর এমন সুযোগ খুব একটা হয় না, কিন্তু ঈদের আগে এই সময়গুলো আমাদের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসে।

ঈদের দিনে সবচেয়ে বিশেষ বিষয় হলো—আম্মুর হাতের রান্না। সেই স্বাদ ও ভালোবাসা অন্য কিছুর সঙ্গে তুলনীয় নয়। ছোটবেলায় হয়তো মা–বাবার ত্যাগগুলো এতটা উপলব্ধি করতে পারিনি। কিন্তু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝেছি, আমাদের জন্য তাঁরা কত কিছু করেছেন। এখন মনে হয়, তাঁদের মুখে হাসি ফোটাতে পারাটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

ঈদের দিন পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালো লাগে। ভাইবোনেরা বড় হয়ে গেলে সবাই নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত হয়ে যায়। তখন মনে হয়, দিন শেষে মা–বাবা একা হয়ে পড়েন। তাই আমার বিশ্বাস, যতটুকু সম্ভব আমাদের সবারই উচিত তাঁদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং এই মুহূর্তগুলো ধরে রাখা, কারণ একসময় হয়তো এর জন্য আফসোস হতে পারে।

শৈশবে মেহজাবীন চৌধুরী

পরিবার আরও বিস্তৃত হয়েছে

যখন দেশে ফিরে আসি, তখন আমার বয়স ১৬ বছর। বিয়ের পর আমার পরিবার আরও বিস্তৃত হয়েছে। এখন স্বামীর পরিবারের সদস্যরাও আমার নিজের পরিবারের মতোই। ফলে ঈদের আনন্দও যেন দ্বিগুণ হয়েছে। ঈদের সময়টা এখন আরও সুন্দরভাবে ভাগ করে নেওয়া হয়। কয়েক দিন মা–বাবার সঙ্গে, কয়েক দিন শ্বশুরবাড়িতে, আবার কখনো সবাই মিলে একসঙ্গে সময় কাটানো হয়। একসঙ্গে ইফতার করা, গল্প করা এবং হাসি–আড্ডায় ঈদের আবহ আরও গভীর হয়ে ওঠে।
এখন ঈদের দিন নিয়ে আলাদা করে পরিকল্পনাও করা হয়।

একসঙ্গে সময় কাটানো, কে কী খেতে পছন্দ করে, তা ভেবে মেনু ঠিক করা—এসব বিষয় খুব আনন্দ দেয়। এখন মনে হয় পেশাগত জীবনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনটিও আমি সমানভাবে উপভোগ করতে পারছি। আলহামদুলিল্লাহ, এই ভারসাম্যই আমাকে সবচেয়ে বেশি তৃপ্তি দেয়।

ছকভাঙা চরিত্রে আলাদা মেহজাবীন

বড়বেলার ঈদ

এবার ঈদটা ঢাকাতেই, পরিবারের সঙ্গেই কাটানোর পরিকল্পনা আছে। আত্মীয়স্বজন, কাছের মানুষেরা বাসায় আসবেন, আমরাও হয়তো কারও বাসায় যাব। ব্যস্ততার ভেতর সারা বছর যাদের সঙ্গে ঠিকমতো সময় কাটানো হয় না, ঈদের সময়টা তাদের সঙ্গেই কাটাতে চাই।

এবার ঈদে চরকিতে মুক্তি পেয়েছে ওয়েব সিরিজ ‘ক্যাকটাস’। ক্যাকটাস আমার কাছে আলাদা। কারণ, গল্পটা ও আমার চরিত্র, দুটোই বেশ ইউনিক। চরিত্রটা করতে গিয়ে অনেক নতুন দিক নিয়ে ভাবতে হয়েছে এবং কিছু জায়গায় নিজেকেও চ্যালেঞ্জ করতে হয়েছে।

পুরো টিম খুব আন্তরিকভাবে কাজ করেছে। তাই আমি মনে করি, দর্শক একটা ভিন্ন স্বাদের গল্প দেখতে পাবেন। আশা করছি, দর্শকদের কাছে কাজটা ভালো লাগবে।

Read at source