ঈদের আনন্দ কি পোশাকে সীমাবদ্ধ
· Prothom Alo

বছর ঘুরে আবার চলে এসেছে ঈদ। রমজানের ওই রোজা একটি–দুটি করে বাইশটি পার হতে চলল। সিয়াম সাধনার পাশাপাশি ঈদের আনন্দকে পরিপূর্ণতা দিতে পুরোদমে জমে উঠেছে ঈদের শপিং। নিম্নবিত্তের মানুষ তাদের স্বল্প আয়ের মধ্যেই করছে কেনাকাটা, পড়ছে আলহামদুলিল্লাহ; আর উচ্চবিত্তের চলছে পছন্দ হলেই কিনে ফেলো–এর প্রতিযোগিতা। মাঝখানে বরাবরের মতোই খাবি খাচ্ছে মধ্যবিত্ত! পছন্দ হলে বাজেট মেলে না, আর বাজেট মিললে পছন্দ হয় না! বেশির ভাগ পরিবারের যা অবস্থা—আয় কম ব্যয় বেশি, সঞ্চয়ের তো প্রশ্নই আসে না! ২০ বছর আগের তুলনায় সমানুপাতিক হারে আয় বাড়লেও জ্যামিতিকহারে বেড়েছে ব্যয়। এর পেছনে রয়েছে নানা কারণ। তার মধ্যে অন্যতম হলো পোশাক-পরিচ্ছদ নিয়ে শো-অফ, অতিরিক্ত ফ্যাশন-সচেতনতা ইত্যাদি। আর গেল কিছু বছরে নতুন যুক্ত হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়াতে সেলিব্রিটি লাইফস্টাইলের প্রভাব উচ্চবিলাসী ব্র্যান্ডের প্রতি আকর্ষণ! এ জন্য সারা বছর একটু–আধটু সঞ্চয়ের প্রবণতা না থাকলেও রয়েছে খরচের তুমুল প্রবণতা।
একটা উদাহরণ দিই। আমরা যারা ভাবি ম্যানহাটানের বাসিন্দা মানেই বলগারি–এর জুয়েলারি, কার্টিয়ের–এর ঘড়ি কিংবা রাফল লরেন–এর পোশাক, তারা কল্পনার জগতে বাস করি। ওখানে প্রচুর মানুষ পাবেন যাঁরা এইচঅ্যান্ডএম, জারা, আমেরিকান ঈগল অথবা ইউনিক্ল–এর পোশাক-পরিচ্ছদ পড়ে দিব্যি জীবন পার করে দিচ্ছে। এমনকি তাদের ইস্টার সানডে-ক্রিসমাসও। কারণ, এগুলো দামে তুলনামূলক সস্তা ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন।
Visit sportnewz.click for more information.
ক্রিশ্চিয়ান লোবোটিনের এক জোড়া জুতার দাম দেড় লাখ ডলারের বেশি, যা দিয়ে ন্যূনতম ৩০০০ জোড়া জারার জুতা কেনা যাবে। মানে শুধু নিজে না, চোদ্দগুষ্টি লোবোটিনের ওই এক জুতার টাকা দিয়ে সারা জীবন জুতা কিনে পরতে পারবেন! রালফ লরেনের একটা সিম্পল লিনেন শার্ট অলমোস্ট ৫০০ ডলার, যেটা দিয়ে ওপরের সস্তা ব্র্যান্ডগুলোর ৮-১০ টা পোশাক পাওয়া যাবে! এখানে কোয়ালিটি টানতে আইসেন না! যেটা আছে সেটা হচ্ছে এলিটিজম, শো-অফ! এ জন্যই রালফ লরেনের মালিকের চেয়ে আমানসিও ওর্তেগা বেশি ধনী! শুধু তাই নয়, পৃথিবীর সেরা ১০ ধনী ব্যক্তির একজন।
লুই ভিতো, বারবেরির মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলো তাদের স্বকীয়তা, অতি উচ্চমূল্য বজায় রাখার জন্য প্রতিবছর প্রচুর পরিমাণে তাদের আনসোল্ড প্রোডাক্টস পুড়িয়ে ফেলে (এত টাকা দিয়ে কয়জন কিনবে? টাকা থাকলেও টাকা সবাইকে কামড়ায় না!) পরিবেশবাদীরা এ নিয়ে বেশ সরব হলেও আদতে লাভ হয়নি। আমাদের দেশি নামজাদা (!) ব্র্যান্ডগুলোর তো আর সেই বালাই নাই। ২-৩ বছর স্টকে পড়ে থাকা মালামাল তারা ডিসকাউন্ট দিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে ঈদ স্পেশাল অফার নামে আর পাবলিকও গ্রোগাসে গিলছে! কাপড়ের টেম্পার থাকুক না থাকুক, ব্র্যান্ডের পোশাক তো পাওয়া গেল! এই বা কম কি?
অতিমাত্রায় দামি পোশাক-আশাকের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে আনন্দ কম, বরং অহমিকাটাই বেশি থাকে। এ জন্যই কথায় আছে—মাটি খাঁটি, স্বর্ণ আধা আর কাপড় (শো-অফ বোঝানো অর্থে) কেনে গাধা!
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
ঈদে দুই-চারটা ব্র্যান্ডের পোশাক বিশেষত পাঞ্জাবি নিয়ে মানুষের আক্ষেপের শেষ নাই! ক্যানরে ভাই? ওইসব জায়গা থেকেই কেন আপনাকে পোশাক কিনতে হবে? পাঞ্জাবি কিনতে হবে? লোকাল মার্কেট কিংবা অনেক অনলাইন শপে রিজনেবল প্রাইসের মধ্যে কষ্ট করে একটু খুঁজলেই মানসম্মত ঈদের পোশাক পাওয়া যাবে। আর আরেকটা তেতো কথা বলতেই হয়—আমদানি আঠানি, খরচা রুপাইয়া স্টাইলে আর কত? আয় বুঝে ব্যয় করুন। কিসের এত ব্র্যান্ড সচেতনতারে ভাই? বিল গেটস বিলিয়ন ডলারের মালিক হয়ে ২৩ ডলারের ক্যাসিও ঘড়ি পড়তে পারলে আপনি আমি কোথাকার কে?
সার কথা হলো ঈদের আনন্দ পরিবার-পরিজনের সঙ্গে মনের খুশিতে ভাগ করে নিন, আপনার পোশাকের ব্র্যান্ড শো-অফ করে নয়। এতে আনন্দ পাবেন, নাহলে কিডনি বেচে পোশাক কিনতে হবে, এই আক্ষেপ নিয়েই আনন্দ মাটি করে যাবেন।
শুভকামনা সবার জন্য। সবার ঈদ পরিপূর্ণতা পাক।
লেখক: রবিউন নাহার তমা