আফগান-পাকিস্তান সংকট কি চাপা পড়ে গেল
· Prothom Alo

এই মুহূর্তে পাকিস্তানের সামনে যে জটিল আঞ্চলিক বাস্তবতা দাঁড়িয়ে আছে, তা নিয়ে আলোচনার জন্য পার্লামেন্টের যৌথ অধিবেশনের মতো উপযুক্ত মঞ্চ আর নেই। উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্রমে বিস্তৃত হতে থাকা যুদ্ধ, আফগানিস্তানে তালেবান সরকারের সঙ্গে পাকিস্তানের টানাপোড়েন আর তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ইসলামাবাদের কূটনৈতিক ভারসাম্য—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা জরুরি হয়ে উঠেছে।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
দেশের সাধারণ মানুষের মনে এখন একাধিক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। যেমন উপসাগরীয় সংঘাতের এই মুহূর্তে পাকিস্তান নিজেকে কী ভূমিকায় দেখতে চায়? আফগানিস্তানের তালেবান সরকার পাকিস্তানের কঠোর অবস্থান সত্ত্বেও কত দিনে সন্ত্রাসবাদ ইস্যুতে ইসলামাবাদের উদ্বেগের জবাব দেবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর স্পষ্ট নয়।
পাকিস্তান আজ যেন এক টান টান দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটছে। একদিকে প্রতিবেশী ইরান, অন্যদিকে ঘনিষ্ঠ আরব মিত্র—বিশেষত সৌদি আরব। সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা চুক্তির পর সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। কিন্তু খুব কম সময়ের মধ্যেই সেই সম্পর্কের কঠিন পরীক্ষা এসে যাবে—এ কথা কেউই বোধ হয় কল্পনা করেনি।
অন্যদিকে আফগানিস্তান নীতি নিয়েও নানা প্রশ্ন ঘনীভূত হচ্ছে। পাকিস্তানের বর্তমান কৌশল আসলে কী? তালেবান সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, নাকি পুরো আফগান নীতিতেই নতুন মোড়? এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু সেই পার্থক্যটি রাষ্ট্র পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করছে না।
একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আরও ঘুরে বেড়াচ্ছে—আফগানিস্তানের বর্তমান উত্তেজনার সঙ্গে কি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাগরাম ঘাঁটি পুনর্দখলের পরিকল্পনার সঙ্গে কোনো যোগ আছে? সম্প্রতি পাকিস্তানি জঙ্গি বিমান যে ঘাঁটিটিকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে, সেটি এই আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে। কিন্তু এই সংবেদনশীল প্রশ্নগুলোর জবাব দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রের ভেতরে যেন তেমন কোনো উন্মুক্ত পরিসর নেই।
সাধারণত রাষ্ট্রযন্ত্র কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে পার্লামেন্টের ভূমিকা সীমিত হয়ে যায়। বরং যখন কোনো সিদ্ধান্তের দায় ভাগ করে নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে, তখনই তা সংসদের আলোচনার জন্য তুলে ধরা হয়।
সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণে পাকিস্তানের অবস্থান আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। একটি সম্ভাব্য কৌশল হতে পারে—গোপনে সৌদি আরবকে সমর্থন করা, কিন্তু কূটনৈতিকভাবে ইরানের পাশে থাকা। কিন্তু বাস্তবে এই ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ নয়। কারণ, ইরান আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে প্রায়ই সাদা-কালোর সরলরেখায় দেখতে অভ্যস্ত।
সম্ভবত আবার এমনই একটি মুহূর্ত এসেছে। সে কারণেই প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে একটি গোপন বৈঠক ডেকেছিলেন। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছে—এই সংকটজনক বিষয়গুলো নিয়ে পার্লামেন্টের যৌথ অধিবেশন আহ্বান করা হবে।
নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে যত বিতর্কই থাকুক, পাকিস্তানের সংসদের দুই কক্ষেই প্রায় সব বড় রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব রয়েছেন। বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখাওয়ার জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় দলগুলোর প্রতিনিধিও আছেন। এমনকি নির্বাচনে পিছিয়ে পড়া আওয়ামী ন্যাশনাল পার্টির জন্য প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি সিনেটের একটি আসনের ব্যবস্থা করেছিলেন।
তবু সংসদের পূর্ণ প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। বেলুচিস্তানের নেতা সরদার আখতার মেনগালের পদত্যাগ গ্রহণ না করলেই ভালো হতো। ক্ষমতাসীনেরা চাইলে তাঁকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানাতে পারতেন। কারণ, বেলুচিস্তান এখন অত্যন্ত সংবেদনশীল এক প্রদেশ।
পাখতুন তাহাফুজ মুভমেন্ট বা পিটিএম নির্বাচনী দল নয়, কিন্তু খাইবার পাখতুনখাওয়ার তরুণ পাখতুনদের বড় অংশের মনোভাব তারা প্রতিনিধিত্ব করে। তাদের ঘনিষ্ঠ আদর্শের দল ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক মুভমেন্টও নির্বাচনে হেরে যাওয়ায় সংসদে নেই। বিরোধী নেতা মাহমুদ খান আছাকজাই হয়তো তাদের কিছু অনুভূতি তুলে ধরতে পারেন। তবে বড় প্রশ্ন পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের ভূমিকা। তারা গোপন বৈঠকে অংশ নেয়নি, যদিও আশা করা হচ্ছে যে যৌথ অধিবেশন তারা বর্জন করবে না। কারণ, আলোচ্য বিষয়টি সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত।
এই অধিবেশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হবে উপসাগরীয় যুদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আক্রমণে শুরু হওয়া এই সংঘাত ক্রমে পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। সুন্নি আরব দেশগুলো আপাতত সংযম দেখাচ্ছে। কিন্তু যদি ইরানের পাল্টা আঘাত অব্যাহত থাকে, তবে প্রতিশোধের মুহূর্ত আসতে পারে, যা হয়তো ইসরায়েলও প্রত্যাশা করছে। সেই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের কৌশলগত অবস্থানও পরীক্ষার মুখে পড়বে।
সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণে পাকিস্তানের অবস্থান আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। একটি সম্ভাব্য কৌশল হতে পারে—গোপনে সৌদি আরবকে সমর্থন করা, কিন্তু কূটনৈতিকভাবে ইরানের পাশে থাকা। কিন্তু বাস্তবে এই ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ নয়। কারণ, ইরান আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে প্রায়ই সাদা-কালোর সরলরেখায় দেখতে অভ্যস্ত।
তার ওপর পাকিস্তানের ভেতরেও ইরানের প্রতি আবেগঘন সমর্থন রয়েছে। ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ডসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলোও দেশে সক্রিয়। তারা সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যেন পাকিস্তান সরাসরি এই যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়ে। একই সঙ্গে দুর্বল অর্থনীতি এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর তেলের ওপর নির্ভরশীলতাও পাকিস্তানের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করবে।
উপসাগরীয় যুদ্ধের এই আলোড়নে পাকিস্তানের আরেক যুদ্ধ—আফগানিস্তানের সঙ্গে সংঘাত—আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রশ্ন উঠছে, তালেবান সরকারের বিশ্বাসঘাতকতা ও সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগের জবাব হিসেবেই কি পাকিস্তান এই পদক্ষেপ নিচ্ছে? নাকি আফগানিস্তান নীতিতেই বড় ধরনের পুনর্বিবেচনা চলছে?
যদি সত্যিই সেই পুনর্বিবেচনা হয়, তবে তা ডুরান্ড লাইনের প্রশ্ন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক, আঞ্চলিক জ্বালানি প্রকল্প, ওয়াখান করিডর এবং বাণিজ্যিক যোগাযোগ—সবকিছুকে প্রভাবিত করবে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তাই এখনো রয়ে গেছে—পাকিস্তান কি শুধু তালেবানকে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের মতো গোষ্ঠীগুলোকে দমন করতে বাধ্য করতে চাইছে? নাকি ভবিষ্যতের আফগানিস্তানের জন্য নতুন মিত্র খুঁজছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সহজ নয়। কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার—আফগানদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ দেওয়া এবং বহুমাত্রিক সহযোগিতার মাধ্যমে সম্পর্ক গড়ে তোলাই দীর্ঘ মেয়াদে সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে।
মোহাম্মাদ আমির রানা পাকিস্তানের নিরাপত্তা বিশ্লেষক
ডন থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ