আহমেদাবাদের সেই ‘চাকার’ যেভাবে যশপ্রীত বুমরা হয়ে উঠলেন
· Prothom Alo

শুরুটা হয়েছিল আহমেদাবাদের তপ্ত রোদে, ধুলো ওড়া নেটে। রোগাপাতলা এক কিশোর বোলার, যার লক্ষ্য ছিল একটাই—ব্যাটসম্যানের মাথা লক্ষ্য করে বল মারা। শর্ট বল ছাড়া সে আর কিছু বোঝে না। তার কোচ কিশোর ত্রিবেদী একদিন ডেকে বললেন, ‘বাপু, শুধু গতি দিয়ে হবে না। টিকে থাকতে হলে বৈচিত্র্য চাই। কাটার শেখো, ইয়র্কার মারো। ব্যাটসম্যানকে বোকা বানাতে শেখো।’
Visit asg-reflektory.pl for more information.
পেশাদার ক্রিকেটে যশপ্রীত বুমরার হাতেখড়ি অন্য ভারতীয় ক্রিকেটারদের তুলনায় বেশ দেরিতে। বয়স তখন তাঁর ১৬। ভারতের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট দুনিয়ায় টিকে থাকতে হলে তাকে শিখতেই হতো। সেই ছিপছিপে ১৬ বছরের কিশোরের কাছে অস্ত্র বলতে ছিল তার অভিনব বোলিং অ্যাকশন আর আগুনে গতি। ওই অ্যাকশন তো আগে কখনো দেখেইনি কেউ! না আহমেদাবাদে, না ভারতে, না পৃথিবীর আর কোথাও।
চন্দ্রগ্রহণে অনুশীলনে অমঙ্গল হবে ভেবে যা করলেন সূর্যকুমাররানেটে সমবয়সী ছেলেরা বুমরাকে খেলতে রীতিমতো ভয় পেত। আড়ালে ফিসফাস চলত, ‘ছেলেটা কি চাকিং করে?’ তবে কথাটা কোচ ত্রিবেদীর কানে গেলে বকুনিও জুটতে পারে, তাই ভয়ে কেউ উচ্চবাচ্য করত না।
ত্রিবেদী স্মৃতি হাতড়ে বলেন, ‘ওর বোলিং অ্যাকশনই ছিল ওর সবচেয়ে বড় অস্ত্র। ওর শুধু বৈচিত্র্য শেখা দরকার ছিল। আর দরকার ছিল মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করা। আমি ওই রকম অ্যাকশন আগে কখনো দেখিনি। যখন দেখলাম একাডেমির অন্য বাচ্চারা ওকে খেলতে হিমশিম খাচ্ছে, আমি তখনই বুঝে গিয়েছিলাম—এই ছেলেটা স্পেশাল হতে যাচ্ছে।’
শৈশবে আমেদাবাদের নেটে শুধু গতির নেশায় থাকা বুমরা আজ বিশ্বসেরা ফাস্ট বোলার।বুমরা ছিলেন দারুণ তীক্ষ্ণ বুদ্ধির এক কিশোর। তিনি মন দিয়ে শুনতেন, শিখতেন, আর সেটা মাঠে কাজে লাগাতেন। সেই শুরুর দিনগুলোতে দ্রুত কিছু শিখে নেওয়ার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা বুমরার ক্যারিয়ারে জাদুর মতো কাজ করেছে। এখন তাঁর বয়স ৩২। নিজের প্রজন্মের অন্যতম সেরা ফাস্ট বোলার, হয়তো সেরাই। এবারের টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপেও তিনি সেটা প্রমাণ করে চলেছেন।
আইসিসি র্যাঙ্কিং: অভিষেকের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছেন ফারহানশুধু পরিসংখ্যান দেখলে কথাটা বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে। টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি বোলারদের তালিকার শীর্ষ দশেও বুমরার নাম নেই। ৯ উইকেট নিয়েছেন তিনি এখন পর্যন্ত, সর্বোচ্চ উইকেট গতকাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের শ্যাডলি ও জিম্বাবুয়ের মুজারাবানির ১৩টি।
তবে যাঁরা নিয়মিত খেলা দেখছেন, তাঁরা নিশ্চিন্তে বলতে পারবেন—ক্যারিয়ারের সেরা কয়েকটি বল সম্ভবত তিনি টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপের এ আসরেই করছেন। সুপার এইটে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচটা ভারত হেরে না গেলে, এই আসরের অন্যতম সেরা বোলিং স্পেলটা তাঁর নামেই লেখা থাকতে পারত। পাওয়ারপ্লেতে কুইন্টন ডি ককের স্টাম্প উপড়ে ফেলেন, রায়ান রিকেলটনকে বানান বোকা। এরপর ডেথ ওভারে দুর্দান্ত এক ফিরতি ক্যাচে ফিরিয়ে দেন করবিন বশকে। বুমরার ৯ উইকেটের ৩টিই প্রোটিয়াদের বিপক্ষে। তবে অন্যান্য ম্যাচে সেভাবে উইকেট পাননি।
অনন্য বোলিং অ্যাকশন ও গতির কারণে কিশোর বয়সেই ব্যাটসম্যানদের ভয়ের কারণ ছিলেন বুমরা।সুনীল গাভাস্কার ও দীনেশ কার্তিকের মতো সাবেক ক্রিকেটাররা বারবার বলছিলেন, পাওয়ারপ্লেতে বুমরাকে ঠিকমতো ব্যবহার করা হোক। কিন্তু এখন পর্যন্ত ভারতের হয়ে ছয়টি ম্যাচে পাওয়ারপ্লেতে তিনি বল করেছেন মাত্র ৮ ওভার! এর অন্যতম কারণ—ভারতীয় দল যশপ্রীত বুমরাকে অনেকটা ‘ফ্লোটার’ হিসেবে ব্যবহার করেছে। ফ্লোটার কথাটা মূলত ব্যাটারদের ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়—ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝে যাঁকে যখন-তখন নামিয়ে দেওয়া। ফ্লোটারের কাজই হলো দলকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তোলা। বুমরার ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা এ রকমই! প্রতিপক্ষ দলের সেরা ব্যাটসম্যানের বিপক্ষে সবচেয়ে কঠিন ওভারগুলো করার জন্যই যেন তাঁর ডাক পড়ে। বিপদে পড়লে যেমন আমরা সুপারহিরোদের খুঁজি, অনেকটা সে রকম।
সেমিফাইনালের জন্য ‘বিশেষ কিছু’ জমিয়ে রেখেছেন অভিষেকসুপার এইটে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ভারতের ম্যাচের কথাই ধরা যাক। পাওয়ারপ্লেতে বুমরা মাত্র ১ ওভার (পঞ্চম ওভার) বল করেছিলেন। এরপর তাঁকে রেখে দেওয়া হয় ক্যারিবীয়দের ভয়ংকর মিডল অর্ডারের জন্য। বুমরা পরে আবার বল করেন ১২তম, ১৮তম ও ২০তম ওভারে। শিমরন হেটমায়ার ও রোস্টন চেজের দুটি মহামূল্যবান উইকেট তুলে নিয়ে ক্যারিবীয় ব্যাটিং লাইনআপে ধস নামালেন।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচের পর ভারতের কোচ গৌতম গম্ভীরকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল—বুমরার ওভারগুলো এমন অদ্ভুতভাবে কেন ভাগ করা হচ্ছে? গম্ভীরের সহজ ব্যাখ্যা ছিল—ভারত বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যানদের আটকাতে বিশ্বের সেরা বোলারকে ব্যবহার করছে। উদ্দেশ্য একটাই, বিপদ সামাল দেওয়া আর ম্যাচে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলা।
গম্ভীর বলেছিলেন, ‘আমরা জানতাম, হেটমায়ার, পাওয়েল আর রাদারফোর্ডের মতো ক্যারিবীয় মিডল অর্ডারের হাতে বিশাল শক্তি আছে। ওরা উঁচু মানের খেলোয়াড়, চাইলেই ম্যাচটা আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারে। আমরা আগে থেকেই জানতাম যে ওদের বল করার জন্য মাঝের ওভারগুলোতে বুমরার মতো কাউকেই আমাদের লাগবে।’
কোচের কথা পরিষ্কার। যখনই ভারতীয় বোলাররা রান বিলাতে শুরু করেন, তখনই ত্রাণকর্তা হিসেবে হাজির হন বুমরা। সোজা কথায়, যেখানে বিপদ, সেখানেই বুমরা।
গম্ভীর আরও বলেন, ‘যখনই একটা বড় রানের ওভার হয়ে যায়, আমরা বুমরার কাছে ফিরে গিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করি। কারণ, টি-টুয়েন্টি ম্যাচে আপনি কখনোই চাইবেন না টানা দুটো বড় রানের ওভার হোক। এতে ম্যাচ হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। তাই আমার কাছে বুমরা হলো ভরসার সবচেয়ে বড় নাম। আমরা তাকে নানাভাবেই ব্যবহার করতে থাকব।’
পাওয়ারপ্লে বা ডেথ ওভার—দলের যেকোনো বিপদে অধিনায়ক ভরসা করেন বুমরার ওপর।একটা সময় ফাস্ট বোলারদের ইনিংসের শুরুতে বল করানোর পর আবার আনা হতো প্রতিপক্ষের লেজটা (টেইল–এন্ডার) বেরিয়ে পড়লে। এখন দিন বদলেছে। উইকেটের হিসাব কষার মতো বিলাসিতা বুমরার নেই। তাঁকে যা বলা হয়, তিনি হাসিমুখে সেটাই করেন। উইকেটের কলামটা সব সময় বুমরার বোলিংয়ের আসল গল্পটা বলতে পারে না। প্রতিপক্ষের মনে তিনি যে কী পরিমাণ ত্রাস ছড়িয়েছেন, তার পুরো ছবিটা সেখানে সব সময় থাকে না।
এবারের বিশ্বকাপে বুমরার ইকোনমি রেট মাত্র ৬.৩০, আর স্ট্রাইক রেট ১৩.৩৩। টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটের মানদণ্ডে এই পরিসংখ্যানকে এককথায় ‘অবাস্তব’ বললেও কম বলা হয়! ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপেও ঠিক এ কাজটাই করেছিলেন তিনি। সেখানে সবচেয়ে ভালো ইকোনমি (৪.০৬) তাঁরই ছিল, কিন্তু বুমরা সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি ছিলেন না।
তবে এসবের কোনো কিছুই বুমরার কাছে খুব একটা যায়-আসে না। তিনি শুধু জিততে চান। ভারতের হয়ে ম্যাচ জেতানোই তাঁর জীবনের একমাত্র নেশা। তাঁর ছোটবেলার কোচ কিশোর ত্রিবেদীর বিশ্বাস, বুমরার ডান হাতটা স্বয়ং ঈশ্বরের ছোঁয়া পাওয়া, ‘ওর বোলিং অ্যাকশন সৃষ্টিকর্তার উপহার। ওর ডান হাত আর ওর শরীরে ঈশ্বরের আশীর্বাদ আছে। ভাবুন তো, এত ছোট একটা কোচিং সেন্টার থেকে পৃথিবীর সেরা বোলার তৈরি হয়েছে—এটা ভেবেই আমার বুকটা আনন্দে ভরে যায়!’
উইকেট সংখ্যায় এগিয়ে না থাকলেও ইকোনমি ও প্রভাবে বুমরা এই বিশ্বকাপে অপ্রতিদ্বন্দ্বী।আহমেদাবাদের রাস্তায় একদিন যাকে ‘চাকার’ বলে ব্যঙ্গ করা হতো, আজ সেই শহরের এবং গোটা দুনিয়ার হাজারো বাচ্চা নেটে বুমরার অ্যাকশন অনুকরণ করতে চায়। ত্রিবেদী তৃপ্তির হাসি হেসে বলেন, ‘আমি খুব খুশি, দারুণ তৃপ্ত। আমি আশা করি, আমার একাডেমি থেকে আরও ফাস্ট বোলার বেরিয়ে আসবে। এখন এখানে এমন তিন-চারটি ১২ বছরের বাচ্চা আছে, যাদের বোলিং অ্যাকশন অবিকল বুমরার মতো। আমি তাদের অ্যাকশন বদলানোর কোনো চেষ্টাই করিনি।’
পরিসংখ্যানের খাতায় হয়তো একদিন ধুলো পড়ে যাবে, কিন্তু এই যে হাজারো কিশোরের চোখে বুমরা হয়ে ওঠার স্বপ্ন—এর চেয়ে বড় স্বীকৃতি, এর চেয়ে বড় আর কী হতে পারে!