আকাশের দ্রুততম শিকারি যে পাখি

· Prothom Alo

আকাশের রাজা হিসেবে পরিচিত পেরেগ্রিন ফ্যালকন পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী এবং বিস্ময়কর শিকারি পাখি। এদের বৈজ্ঞানিক নাম ফ্যালকো পেরেগ্রিনাস। মূলত মাংসাশী এই পাখি তার অবিশ্বাস্য গতির জন্য সমাদৃত। বন্য পরিবেশে এরা গড়ে ১৭ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। একটি পূর্ণবয়স্ক পেরেগ্রিন ফ্যালকনের দেহ ১৪ থেকে ১৯ ইঞ্চি লম্বা হয় এবং ডানা মেললে তার বিস্তার ৩.৩ থেকে ৩.৬ ফুট পর্যন্ত হতে পারে। এদের ওজন সাধারণত ১৮.৮ থেকে ৫৬.৫ আউন্সের মধ্যে হয়।

পেরেগ্রিন ফ্যালকন অত্যন্ত দক্ষ শিকারি। এরা মূলত উড়ন্ত অবস্থায় অন্যান্য পাখি এবং বাদুড় শিকার করে। এদের শিকার ধরার কৌশলটি বেশ রোমাঞ্চকর। এরা আকাশের অনেক ওপর থেকে শিকার লক্ষ্য করে এবং সুযোগ বুঝে আচমকা নিচের দিকে খাড়াভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই বিশেষ ধরনের ডাইভকে বলা হয় স্টুপ। এই সময়ে এদের গতিবেগ ঘণ্টায় ২০০ মাইল (৩২০ কিলোমিটার) ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা এদেরকে প্রাণিজগতের দ্রুততম সদস্যের মর্যাদা দিয়েছে।

Visit forestarrow.help for more information.

অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশ বাদে পৃথিবীর প্রায় সব মহাদেশেই পেরেগ্রিন ফ্যালকন দেখা যায়। এরা মূলত উন্মুক্ত স্থান পছন্দ করে। বিশেষ করে সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলে, যেখানে ছোট ছোট জলচর পাখির আধিক্য থাকে, সেখানে এদের বেশি দেখা যায়। তবে তুন্দ্রা অঞ্চল থেকে শুরু করে উত্তপ্ত মরুভূমিসহ সব জায়গাতেই এদের বিচরণ রয়েছে। বর্তমানে বড় বড় শহরের আকাশচুম্বী দালান বা ব্রিজের ওপরেও এদের বাস করতে দেখা যায়।

পেরেগ্রিন শব্দের অর্থ হলো পরিভ্রমণকারী বা ভবঘুরে। এদের নামের সার্থকতা পাওয়া যায় এদের জীবনযাত্রায়। প্রজনন ঋতুর বাইরে এরা প্রচুর ভ্রমণ করে। যদিও কিছু পেরেগ্রিন নির্দিষ্ট স্থানে স্থায়ীভাবে বসবাস করে, তবে এদের বিশাল একটি অংশ পরিযায়ী। যারা আর্কটিক তুন্দ্রা অঞ্চলে বাসা বাঁধে এবং শীতকাল কাটানোর জন্য দক্ষিণ আমেরিকায় যায়, তারা বছরে প্রায় ১৫ হাজার ৫০০ মাইল পথ পাড়ি দেয়। এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিলেও এদের দিকনির্ণয় ক্ষমতা ও স্মৃতিশক্তি প্রখর। এরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাদের পুরোনো বাসস্থানেই ফিরে আসে। কিছু কিছু বিশেষ বাসার জায়গা শত শত বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন প্রজন্মের ফ্যালকনরা ব্যবহার করে আসছে।

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে পেরেগ্রিন ফ্যালকনের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গিয়েছিল। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এরা বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। ডিডিটি এবং অন্যান্য রাসায়নিক কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে এদের ডিমের খোলস পাতলা হয়ে যেত এবং প্রজনন ব্যাহত হতো। তবে পরবর্তী সময়ে ডিডিটি নিষিদ্ধ করা এবং কৃত্রিম প্রজনন কর্মসূচির মাধ্যমে এদের সংখ্যা আবার বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ বিশ্বের অধিকাংশ স্থানে এদের সংখ্যা স্থিতিশীল এবং শক্তিশালী। এমনকি কিছু অঞ্চলে বিংশ শতাব্দীর সংকটের আগের তুলনায় এখন পেরেগ্রিন ফ্যালকনের সংখ্যা বেশি। আইইউসিএন রেড লিস্ট অনুযায়ী বর্তমানে এদের অবস্থা ন্যূনতম উদ্বেগজনক।

ঐতিহাসিকভাবেই পেরেগ্রিন ফ্যালকন মানুষের খুব কাছের। বিশেষ করে শিকারি পাখি দিয়ে শিকার করার খেলায় কয়েক শতাব্দী ধরে এদের ব্যবহার হয়ে আসছে। শিকারিদের কাছে এদের ক্ষিপ্রতা এবং বুদ্ধিমত্তা অত্যন্ত মর্যাদার বিষয়।

সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক

Read at source