সরকারি চা–বাগানের দিকে মনোযোগ দিন
· Prothom Alo

একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ হচ্ছে, কাজির গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই। এর সহজ অর্থ আছে, কাগজে-কলমে বা নথিপত্রে কোনো কিছুর অস্তিত্ব জোরালোভাবে দেখানো হলেও বাস্তবে বা কাজের ক্ষেত্রে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। এমনটিই দেখা যাচ্ছে মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলায় একটি চা–বাগানের ক্ষেত্রে। সেখানে নথিপত্রে নাম থাকা বহু শ্রমিকের অস্তিত্ব নেই। এখানে বড় ধরনের অনিয়ম ঘটেছে, তা স্পষ্ট। বিষয়টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার নিউ সমনবাগ চা–বাগানে এ ঘটনা ঘটেছে। দেখা যাচ্ছে, নথিতে নাম থাকা কেউ বহু বছর আগে মারা গেছেন, কেউ অবসরে গেছেন, কারও আদৌ অস্তিত্ব নেই। এমন ৪০ জন অস্তিত্বহীন শ্রমিকের সন্ধান মিলেছে, আরও ১৭০ জনের নাম–ঠিকানা ভুয়া। ১ হাজার ৮২০ শ্রমিকের মধ্যে মাত্র ৩১৫ জনের তথ্য সঠিক পাওয়া গেছে। স্বাভাবিকভাবেই এমন চিত্র নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
Visit albergomalica.it for more information.
এ ঘটনা প্রমাণ করে, দীর্ঘদিন ধরে যাচাই–বাছাই ও নজরদারির প্রক্রিয়া কার্যত অকার্যকর ছিল। এই অনিয়মে প্রতি মাসে প্রায় ১ কোটি টাকা এবং বছরে ১২ কোটি টাকা অপচয়ের অভিযোগ উঠেছে। রাষ্ট্রীয় অর্থের ক্ষতি যেমন হচ্ছে, তেমনি প্রকৃত শ্রমিকেরা বঞ্চিত হচ্ছেন ন্যায্য অধিকার থেকে। ভুয়া নামের আড়ালে কেউ বেতন, রেশন, প্রভিডেন্ট ফান্ড নিচ্ছেন, কেউ বাগানের জমি ব্যবহার করে দোকানপাট গড়ে ভাড়া আদায় করছেন। এতে উৎপাদনশীলতার বদলে তৈরি হয়েছে প্রভাব ও সুবিধাভোগের সংস্কৃতি।
উৎপাদনের পরিসংখ্যানও এই ব্যর্থতার সাক্ষ্য দেয়। নিউ সমনবাগ চা-বাগান থেকেও অর্ধেকের কম জমি ও এক–তৃতীয়াংশ শ্রমিক নিয়ে হবিগঞ্জের বেসরকারি মধুপুর বাগান এক লাখ কেজি বেশি চা উৎপাদন করেছে। সরকারি চায়ের বাগানে মাথাপিছু উৎপাদন যেখানে ৪৩৫ কেজি, সেখানে করিমপুর বাগানে তা ১ হাজার ২০১ কেজি। এ ব্যবধান জবাবদিহির ঘাটতি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার ফল।
চারা পুনর্রোপণে অবহেলাও উৎপাদন কমার বড় কারণ। বরাদ্দের অর্থ খরচ হলেও ৩০ শতাংশ জমি ফাঁকা। লোকসান সামাল দিতে আট বছরে ৩৩ কোটি টাকা স্থায়ী আমানত ভেঙে শ্রমিকদের বেতন দিতে হয়েছে। এটি দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই আর্থিক মডেল নয়।
সমাধানে দরকার কাঠামোগত পরিবর্তন। শ্রমিক তালিকা ও প্রভিডেন্ট ফান্ডে ডিজিটাল ও বায়োমেট্রিক যাচাই, স্বাধীন অডিট, নিয়মিত সামাজিক নিরীক্ষা এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে চারা পুনর্রোপণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামোয় কার্যকর বিনিয়োগ প্রয়োজন। জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে আস্থার সংকট কাটবে না।
চা বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সম্ভাবনার খাত। কিন্তু ভুতুড়ে শ্রমিক ও আর্থিক অপচয় চলতে থাকলে সেই সম্ভাবনা অধরাই থেকে যাবে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় এখনই স্বচ্ছ ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।